২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর কোনো নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি বলে সংসদে সাফ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই বক্তব্য দেন। প্রশ্ন ছিল; যেসব নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের আবার বিজিবিতে চাকরি দেওয়া হবে কিনা। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বর্ণিত শাস্তি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে বিচার করে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্তান্তে প্রদান করা হয়েছে এবং কোনো নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি বিধায় বর্ণিত চাকরিচ্যুত সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহালের সুযোগ নেই।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ১৭ বছর ধরে চলা বিতর্কের একধরনের স্পষ্ট জবাব দিল সরকার, তবে এই জবাব নিয়ে বিতর্কও কম নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন বিডিআরের আইন ও বিধি অনুযায়ী গঠিত বিভাগীয় স্পেশাল কোর্ট এবং প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন ইউনিট কর্তৃক গঠিত তদন্ত পর্ষদের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। এরপর ৬ হাজার ২৮৬ জন বিডিআর সদস্যকে চাকরি থেকে বরখাস্ত (বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডসহ) এবং প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে ২ হাজার ৫১০ জন বিডিআর সদস্যকে পেনশন সুবিধাসহ চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বমোট ৮ হাজার ৭৯৬ জন বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি আলাদা, কারণ বিডিআর কল্যাণ পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে আসছে, ১৮ হাজার ৫২০ জন বিডিআর সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবে সেই সংখ্যার উল্লেখ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের মধ্য থেকে ৮৫০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা এবং ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরক মামলা দায়ের করা হয়। হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়েছে, যার দরুন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বিস্ফোরক মামলায় ৮৩৪ জন বিডিআর সদস্যের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য চলমান। এমতাবস্থায়, বর্ণিত বিডিআর সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকায় আসামিভুক্ত চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহ দমনের নামে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও ৭ জন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে ১৮টি বিশেষ আদালত গঠন করা হয় এবং বহু বিডিআর সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পরে বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাখা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও বিডিআর সদস্যদের পুনর্বহালের দাবি কিন্তু থেমে নেই। চাকরিচ্যুত সদস্যদের বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলন করে আসছে। তাদের দাবি, নিরপরাধ সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহাল, ক্ষতিপূরণ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জবাব আসলে দুই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলো, যাদের বিরুদ্ধে হত্যা বা বিস্ফোরক মামলা চলছে, তাদের পুনর্বহালের প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে যারা দাবি করছেন তারা নিরপরাধ, তাদের জন্য আইনি পথ খোলা আছে, তারা আদালতে প্রমাণ করতে পারলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আপিল বিভাগে মামলা চলার কারণে বিডিআর সদস্যদের পুনর্বহালের বিষয়টি আপাতত আইনি জটিলতার মধ্যেই আটকে আছে। এখন দেখার বিষয়, আদালতের চূড়ান্ত রায়ে এই সংখ্যা ও অবস্থান কতটা বদলায়, আর সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর চাকরিচ্যুত সদস্যরা কী পথে এগোয়।

