একসময় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সস্তা ও নমনীয় ঋণের উৎস ছিল জাপান। পাঁচ বছর আগেও জাপানি ঋণের গড় সুদহার ছিল ১ শতাংশের কম। এখন সেই সুদহার ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের জুনে নেওয়া বাজেট সহায়তার ঋণে সুদহার ছিল ৩.০৫ শতাংশ। ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের শেষ নাগাদ এই হার আরও বেড়ে সাড়ে ৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ফলে জাপান এখন আর সস্তা ঋণের বড় উৎস নয়, এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই বিকল্প খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
জাপানি ঋণের সুদহার বৃদ্ধির ধারাটি পরিষ্কার। ইআরডি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের ৮টি প্রকল্পে জাপান থেকে ঋণ নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৭টি চুক্তিই হয়েছিল ০.৬ শতাংশ সুদে। যমুনা রেলব্রিজ, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও এমআরটি উত্তর লাইন-৫ প্রকল্প ছিল সেগুলোর মধ্যে। ২০২২ সালে সুদহার বেড়ে ০.৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১.২ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১.৭ শতাংশ এবং গত বছর ২ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ এপ্রিল ২০২৬ থেকে নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে ৩.০৫ শতাংশ। জাইকা প্রতি ছয় মাস পরপর বাংলাদেশের জন্য ঋণের শর্তাবলি পুনর্মূল্যায়ন করে, তাই সেপ্টেম্বরে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন বাড়ছে সুদহার? ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, জাপানের অর্থনীতির অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় দেশটি নিজেদের নীতি সুদহার বাড়াচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, জাপান আঞ্চলিক সব দেশের জন্যই ঋণের সুদহার বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করার পর থেকে ঋণদাতা সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কম সুদহারের সুবিধা কমিয়ে আনছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, “এখন বৈশ্বিক ঋণের বাজার কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই একক নির্ভরতা না রেখে এমন উৎস খোঁজা দরকার, যেখানে দর-কষাকষির সুযোগ থাকবে।”
সুদহার বেশি হলেই ঋণ ব্যয়বহুল, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ ঋণের মেয়াদ, গ্রেস পিরিয়ড এবং কাজের মানও হিসাবের মধ্যে আসে। জাপানি ঋণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পরিশোধের মেয়াদ গড়ে ৩০ বছরের বেশি এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর। ফলে কিস্তির চাপ অনেক কমে যায়। এছাড়া জাপান ঋণ মওকুফ তহবিল (জেডিসিএফ)-এর মাধ্যমে সুদের একটি অংশ পরিশোধ না করে আবার অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে চীন বা ভারত থেকে ১ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও পরিশোধের সময় মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছর, যা দ্রুত পরিশোধের চাপ তৈরি করে। তবে জাপানি ঋণের একটি বড় শর্ত হলো; প্রকল্পে জাপানি ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ করতে হয়।
সমস্যা হলো, সুদহার বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর ব্যয়ও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প প্রথমে ১৩,৬১০ কোটি টাকায় শুরু হলেও সংশোধনের পর তা ২১,৩৬৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, এখন আরও বাড়িয়ে ২২,২৬৭ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৫২,৫৬১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা এবং লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ৪১,২৩৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। সুদহার বৃদ্ধি ও প্রকল্প ব্যয়, দুই চাপ একসঙ্গে আসায় সরকারের দায়দেনা পরিশোধের বোঝা আরও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থায়নের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি ইকুইটি, বন্ড মার্কেট ও কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নে যাওয়ার কথা বলেছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর সতর্কবার্তা হলো “বিদেশি অর্থায়ন পেতে দেশীয় বন্ড ও পুঁজিবাজার উন্নত করতে হবে। দেশ যেন ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সে জন্য এখন অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।” অর্থাৎ, শুধু নতুন উৎস খুঁজলেই হবে না, নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।

