ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে ৯ বছর ধরে চলা কর মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি বশির উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আয়কর পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গ্রামীণ কল্যাণকে। এর আগে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে এনবিআরের এই কর দাবি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক একাধিক রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছিল। আদালত সেই রিট খারিজ করে দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ভাষ্য, এই রায়ের ফলে গ্রামীণ কল্যাণকে নির্ধারিত বকেয়া কর এনবিআরকে পরিশোধ করতে হবে।
মামলার শিকড় ২০১৭ সালে গিয়ে পৌঁছায়। ওই বছরের ৭ ও ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার ১৪ নম্বর কর অঞ্চল দুটি আলাদা বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭, এই পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে কর বাবদ ৬০০ কোটি টাকার বেশি দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ কল্যাণ দুটি রিট আবেদন দায়ের করে। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে এবং কর দাবির ওপর স্থগিতাদেশ দেন। কিন্তু দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ কর দাবির পক্ষে রায় দেয়। এরপর গ্রামীণ কল্যাণ আপিল বিভাগে যায়। ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেয় এবং গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন। কিন্তু অক্টোবরে সেই রায় প্রত্যাহার করা হয়।
রায় প্রত্যাহারের পেছনে ছিল একটি ব্যতিক্রমী কারণ। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর হাইকোর্টের বেঞ্চ রায়টি স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ হিসেবে জানা যায়, বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর রায়ের পূর্ণাঙ্গ পাঠ তৈরির সময় জানান যে তিনি আগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সরকারের পক্ষে এই মামলায় কাজ করেছেন। এই স্বার্থের সংঘাতের কারণে আদালত রায়টি প্রত্যাহার করেন এবং মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠানোর জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে নথি পাঠিয়ে দেন। সেই অনুযায়ী নতুন বেঞ্চে শুনানি শুরু হয় এবং ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়।
গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেছেন, এই মামলাটি আসলে কর ফাঁকির নয়, বরং দ্বৈত কর আরোপের বৈধতার প্রশ্ন। তিনি জানিয়েছেন, ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চুক্তির ভিত্তিতে পাওয়া মুনাফার ওপর গ্রামীণ কল্যাণ ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ হারে উৎস কর পরিশোধ করেছে। এরপর ২০১৭ সালে কর গোয়েন্দা বিভাগের উদ্যোগে পুনর্মূল্যায়ন করে অতিরিক্ত ৬৬৬ কোটি টাকা দাবি করা হয়। মামুনের মতে, একই আয়ের ওপর দ্বিতীয়বার কর আরোপের বৈধতা নিয়েই আদালতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গ্রামীণ কল্যাণ কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় পরিচালিত একটি অলাভজনক সংস্থা, যার কোনো ব্যক্তিমালিকানা নেই। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার পর গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রামীণ কল্যাণ কর ফাঁকি দিয়েছে। সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ২০১১-১২ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত সাত করবর্ষে প্রায় ৫৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আয়কর দেয়নি। ওই সময়ে গ্রামীণ কল্যাণ দাবি করেছিল, তাদের ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মীদের বেতন, গ্রামীণ কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন ও আসবাবপত্র ক্রয়। কিন্তু এনবিআরের কর কমিশনার দেখেন, এই ব্যয়ের পক্ষে কোনো বৈধ নথি নেই। কর কমিশনার তাদের হিসাব চ্যালেঞ্জ করেন এবং সমর্থনে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর গ্রামীণ কল্যাণ প্রথমে কর কমিশনার, পরে কর আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং সর্বশেষে হাইকোর্টে আপিল করে। বর্তমানে এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছে, যা মূল দাবির তুলনায় কিছুটা কম।
এই রায় শুধু গ্রামীণ কল্যাণের জন্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে অলাভজনক সংস্থাগুলোর কর চর্চার ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ প্রশ্ন উঠেছে, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক মুনাফার কী পরিমাণ অংশ ব্যয় দেখাতে পারবে এবং সেই ব্যয়ের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন? হাইকোর্টের এই রায় সেই প্রশ্নের একটি স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। তবে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পর তারা আপিল বিভাগে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। মামলাটি দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলার পর একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু আইনি লড়াই শেষ হয়নি, এটি আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

