দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ওপর দিয়ে ভারতের প্রস্তাবিত ৭৬৫ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডর আবারও আলোচনায় এসেছে। ভারতের আসাম রাজ্যের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত এই উচ্চক্ষমতার সঞ্চালন লাইন বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নির্মাণ করতে চায় দিল্লি। প্রকল্পটি পুরোনো হলেও গত আগস্টে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর নতুন তাগাদার পর এটি ফের সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ এখন সরাসরি ‘হ্যাঁ’ না বলে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় চারটি শর্ত সামনে রেখে আলোচনায় এগোতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই করিডর কি সত্যিই বাংলাদেশের জন্য লাভজনক, নাকি এটি একটি ‘মরণফাঁদ’?
প্রথমেই বুঝে নিতে হবে, প্রকল্পটি আসলে কী। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মূল ভূখণ্ডে নিতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর হয়ে ১৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে থাকবে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশের ভূখণ্ড এখানে মূলত একটি ট্রানজিট বা করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন সরকার প্রকল্পটিতে প্রাথমিক সম্মতি দিলেও, ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে; পূর্বের বাতিল সিদ্ধান্ত কি বহাল আছে, নাকি পরিস্থিতি বদলেছে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশ চারটি শর্ত সামনে রেখেছে। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো; ভারতকে স্পষ্ট করতে হবে, ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এই লাইন দিয়ে প্রবাহিত করা হবে কি না। কারণ ব্রহ্মপুত্রের উজানে ভারতের পরিকল্পিত বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে, যা কৃষি, নদীপথ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য আলাদা গ্রিড লাইন তৈরির সুযোগ দেওয়া। তৃতীয়ত, এই লাইন দিয়ে বাংলাদেশ কত পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে তা স্পষ্ট করতে হবে। চতুর্থত, লাইন টানার আগে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির পূর্ণ হিসাব করতে হবে।
অর্থনৈতিক দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের মূল সুবিধাভোগী ভারত হলেও বাংলাদেশ অংশের সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ভারতের এক্সিম ব্যাংক এই ঋণ দেবে, কিন্তু ঋণ পরিশোধের দায় পড়বে বাংলাদেশের ওপর। অথচ বাংলাদেশ এই করিডর থেকে পাবে শুধু ‘হুইলিং চার্জ’ বা সঞ্চালন ফি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই করিডরের মাধ্যমে এককভাবে ভারতই লাভবান হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ফলে মাত্র এক হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্য এত বড় আর্থিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশ ও কৃষি জমির প্রভাবও কম নয়। দিনাজপুর ও পার্বতীপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন গেলে ৩ হাজার একরের বেশি উর্বর কৃষি জমি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চক্ষমতার টাওয়ার নির্মাণ, রাইট অব ওয়ে এবং নিরাপত্তা এলাকার কারণে জমির স্বাভাবিক ব্যবহার সীমিত হয়ে যাবে। কৃষকরা জমির মালিকানা ধরে রাখলেও আগের মতো কৃষি কাজ বা অন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবেন না। বাংলাদেশের মতো উচ্চ জনঘনত্বের দেশে শুধু ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং, দিবাং ও সুবানসিরিসহ বিভিন্ন নদীতে বড় আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নদীর পানি শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। উজানে বাঁধ ও জলাধার নির্মিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের কৃষি, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডর দিলে বাংলাদেশ কার্যত ভারতের উজানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবহনে সহায়তা করবে, এটি পানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প ইতিমধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করে আঞ্চলিক সহযোগিতার পক্ষে, যেখানে ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশ মিলে একটি যৌথ গ্রিড ব্যবস্থা থাকবে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ স্পষ্ট বলেছেন, ‘ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেভাবে আমরা চিন্তা করছি না।’ অন্যদিকে ভারত চাইছে দ্বিপাক্ষিক কাঠামোতে নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে। তাই আগামী দিনে এই করিডর নিয়ে আলোচনা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি কৌশলগত ও কূটনৈতিক হিসাবেরও বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সরকার দ্রুত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

