আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের এখনো পাড়ি দিতে হয় প্রায় আট দশক পুরোনো এক আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা। ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর, ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর, ভ্যাট ও কাস্টমস নিবন্ধনের মতো প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরেও আলাদাভাবে নিতে হয় আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ—যা মূলত ঔপনিবেশিক আমলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অবশিষ্টাংশ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আধুনিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ব্যবস্থার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই।
এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সূচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ বিধি জারি করেছিল। পরবর্তীতে দেশভাগের পর নতুন গঠিত পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট দেখা দিলে সেই পুরোনো বিধিকে আরও সম্প্রসারিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল আমদানি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। বিস্ময়করভাবে, প্রায় আট দশক পার হলেও বাংলাদেশ এখনো সেই পুরোনো কাঠামোর একটি বড় অংশ বহন করে চলেছে।
এই আইনের আওতায় আজও ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ নিতে হচ্ছে। আগে বার্ষিক নবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়নের সুযোগ রয়েছে। এসব সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য রাজধানীতে প্রধান কার্যালয়সহ সারা দেশে মোট চৌদ্দটি আঞ্চলিক দপ্তর কাজ করছে।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যে পাকিস্তান সরকার মূলত এই আইনের প্রবর্তক ছিল, তারাই প্রায় দুই যুগ আগে এটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে। ফলে বর্তমানে পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের মতো আলাদা সনদ নিতে হয় না, বরং কাস্টমসের ওয়েবভিত্তিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই তাঁরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হতে পারেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, যে আইনের ভিত্তিতে বাংলাদেশে এই সনদ ইস্যু করা হয়, সেই আইন পাকিস্তান বহু আগেই বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের কোনো সনদের প্রয়োজনই নেই, আর ভারতে একবার সনদ নিলে তা আর নবায়ন করার প্রয়োজন হয় না। তাঁর মতে, বাংলাদেশে যেহেতু বিধি সহজীকরণের উদ্যোগ চলছে, তাই আলাদা সনদের পরিবর্তে ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমেই আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দেওয়া উচিত।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে প্রায় ঊনপঞ্চাশ ধরনের বিভিন্ন সনদ ও অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ক্যাটাগরিতে সনদের ফি শুরু হয় পাঁচ হাজার টাকা থেকে, নবায়ন ফি তিন হাজার টাকা, আর সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে এই ফি বেড়ে দাঁড়ায় আশি হাজার টাকায়। রপ্তানিকারকদের জন্যও রয়েছে ছয় ধরনের পৃথক নিবন্ধন ব্যবস্থা, যার প্রতিটির প্রাথমিক ফি অন্তত দশ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, শুধু সনদ গ্রহণের ঝামেলাতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়, নির্দিষ্ট সময় পরপর নবায়নের বাধ্যবাধকতাও তাঁদের জন্য বাড়তি সময় ও ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষত ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর এই চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে, কারণ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব প্রশাসনিক দল রাখতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের প্রায়ই তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হয়, যা তাঁদের প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভৌগোলিক দূরত্বের সমস্যাও—মাত্র চৌদ্দটি আঞ্চলিক দপ্তরের কারণে বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের প্রায়ই দূরবর্তী শহরে গিয়ে সনদ সংক্রান্ত কাজ সারতে হয়।
এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে শুধু কাস্টমস নিবন্ধনের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারেন, আলাদা কোনো আমদানি-রপ্তানি সনদের প্রয়োজন হয় না। ভিয়েতনামেও সাধারণ পণ্যের ক্ষেত্রে এমন পৃথক সনদের বাধ্যবাধকতা নেই, আর মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতেও একই চিত্র দেখা যায়।
এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের একজন প্রশাসক স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে এই ধরনের সনদের আর কোনো বাস্তব প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে বিধি সহজীকরণে জোর দিতে হবে এবং অন্তত আঞ্চলিক পর্যায়ের সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করা জরুরি। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট নীতি আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত আছে এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমদানি সম্পন্ন করা সম্ভব, তাই পৃথক সনদের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরসি-ইআরসি ব্যবস্থা এমন এক সময়ে গড়ে উঠেছিল যখন বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিষয়। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস প্রক্রিয়া, ব্যাংকিং নজরদারি ও কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই এখন সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের পরিচয় ও লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছানোর অনেক বেশি কার্যকর উপায় বিদ্যমান। ব্যবসায়ী সংগঠনের ওই প্রশাসকের ভাষায়, এই বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়ই উপকৃত হবে—একদিকে ব্যবসায়ীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন, অন্যদিকে সরকারকেও সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখতে হবে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, ব্যবসা-বিনিয়োগ সহজীকরণের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে বিধি সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি খতিয়ে দেখছে কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করা সম্ভব। তাঁর ভাষ্যমতে, ঊনিশশো পঞ্চাশ সালের আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনটিও এই পর্যালোচনার অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রাথমিক ধাপে এই আইনের অধীনে থাকা কোন কোন সনদের বাস্তবে আর প্রয়োজন নেই, তা চিহ্নিত করে সেই বাধ্যবাধকতাগুলো প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে পুরো আইনটিই নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে, আর যদি এটি বহাল রাখা প্রয়োজনীয় মনে হয়, তাহলে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তা সংশোধন ও সহজ করা হবে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকার পেছনে এ ধরনের পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলো যখন ক্রমাগত বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করে বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বহাল থাকা দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন। সরকারের বর্তমান পর্যালোচনা প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব হবে কিনা।

