দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত যশোরের বেনাপোল দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে টানা পতনের ধারা। বিগত তিন অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে আমদানি-রপ্তানি উভয়ই, তবে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে রপ্তানি খাতে।
সবশেষ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিপ্পান্ন শতাংশ এবং রপ্তানির আর্থিক মূল্য প্রায় ঊনসত্তর শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে আমদানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বন্দরের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত তিন অর্থবছর মিলিয়ে এই বন্দর দিয়ে মোট প্রায় সাতচল্লিশ লাখ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় একাশি হাজার ছয়শ কোটি টাকা। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে দশ লাখ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ঊনত্রিশ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা।
বছরভিত্তিক হিসাব করলে বোঝা যায়, তিন বছর আগে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন, যার মূল্য ছিল প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা। এর পরের বছর রপ্তানির পরিমাণ সামান্য কমলেও আর্থিক মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে তেরো হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু সবশেষ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়—রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে মাত্র প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টনে, আর মূল্য কমে দাঁড়ায় চার হাজার একশ কোটি টাকার কাছাকাছি। বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে।
স্থানীয় একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এই মন্দার পেছনে একাধিক কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি দেশীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, যার ফলে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমে যাচ্ছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের প্রথম দুই বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল, বর্তমানে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
আমদানির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিন বছর আগে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় সতেরো লাখ মেট্রিক টন, যার মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। এরপরের বছর পরিমাণ কিছুটা কমলেও মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ঊনত্রিশ হাজার কোটি টাকায়। সবশেষ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় চৌদ্দ লাখ মেট্রিক টনে, যার মূল্য ছিল প্রায় সাতাশ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিন বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ কমেছে প্রায় সাড়ে আঠারো শতাংশ।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা চুক্তির আওতায় আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গড় শুল্কহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা রাজস্ব আদায়ে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সবশেষ অর্থবছরে এই সুবিধার আওতায় সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে—মোট আমদানির প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশই এসেছে এই বিশেষ সুবিধায়, যেখানে আগের দুই বছরে এই হার ছিল যথাক্রমে এগারো ও সাত শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা ক্রমেই এই সুবিধা বেশি ব্যবহার করছেন বলে কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বেনাপোল কাস্টম হাউসের একজন কমিশনার মন্তব্য করেছেন, আমদানি-রপ্তানি কমার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করা কাস্টমস বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, এটি ব্যাংক কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে রাজস্ব আয় হ্রাসের বিষয়ে তাঁরা নিয়মিতভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়ে থাকেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে পণ্য আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বও বেড়েছে, তবে শুল্কমুক্ত পণ্যের আমদানি বেশি হলে রাজস্বের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষত তুলার মতো শীর্ষস্থানীয় আমদানি পণ্য শুল্কমুক্ত হওয়ায় এবং সাফটা সুবিধার ব্যবহার ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সামগ্রিক রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
রপ্তানি পণ্যের তালিকায়ও লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। আগের অর্থবছরে কাঁচাপাট ও তৈরি পোশাক রপ্তানির শীর্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব পণ্যের রপ্তানি কমে গিয়ে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, সুপারি, মাছ, সুতা ও ঝুটের মতো পণ্য শীর্ষস্থান দখল করেছে। অন্যদিকে আমদানি পণ্যের তালিকায় শিল্পের কাঁচামাল ও কৃষিপণ্যেরই প্রাধান্য অব্যাহত রয়েছে, যার মধ্যে স্পঞ্জ আয়রন ও তুলা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আমদানি হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শুধু অর্থনৈতিক অস্থিরতাই নয়, বন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এই মন্দার একটি বড় কারণ। বেনাপোল বন্দরের ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে পেট্রোপোল বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেনাপোল বন্দরের এই বাণিজ্যিক মন্দা কেবল কোনো একক কারণে ঘটেনি, বরং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা, ব্যাংকিং খাতের কড়াকড়ি এবং সীমান্তের দুই পাশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা—এসব বিষয় একত্রে মিলেই এই পতনের প্রবণতা তৈরি করেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া নিকট ভবিষ্যতে এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।

