দেশে সবুজ বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই দুই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগে বড় পতন হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের উদ্যোগও বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ টেকসই অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সবুজ অর্থায়নে ঋণ বিতরণ কমেছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। আর টেকসই অর্থায়নে কমেছে ৪৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা।
সবুজ অর্থায়ন কমেছে ২১ শতাংশের বেশি
২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সবুজ খাতে অর্থায়ন কমেছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ২১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
সবুজ অর্থায়নের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়।
টেকসই অর্থায়নে কমেছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা
সবুজ অর্থায়নের পাশাপাশি টেকসই অর্থায়নেও বড় পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে এ খাতে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।
এক বছরে টেকসই অর্থায়ন কমেছে ৪৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩২ শতাংশের পতন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা অনুযায়ী, ১১টি শ্রেণির আওতায় ৬৮ ধরনের টেকসই পণ্যে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারে। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ টেকসই খাতে এবং মোট মেয়াদি ঋণের ৫ শতাংশ পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রকল্পে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঋণের চাহিদা কমার কথা বলছেন ব্যাংকাররা
সবুজ ও টেকসই অর্থায়নে এই পতনের জন্য ব্যাংকাররা মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল থাকায় বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
অন্যদিকে কিছু ব্যাংক তারল্যসংকটে রয়েছে। পাশাপাশি সরকারও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে তুলনামূলক বেশি ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ কমেছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে প্রস্তুত। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাত থেকেই ঋণের চাহিদা খুব বেশি তৈরি হচ্ছে না।
অর্থায়নের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন
তবে শুধু অর্থায়ন কমে যাওয়াই নয়, যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে তার যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উদ্যোক্তারা ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার করছেন কি না এবং ব্যাংকগুলো সেই অর্থের ব্যবহার ঠিকভাবে তদারক করছে কি না—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, টেকসই ও সবুজ অর্থায়ন বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করছে। বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবছর টেকসই অর্থায়নসংক্রান্ত রেটিংও প্রকাশ করা হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামীতে এই খাতে ঋণ বিতরণ আবার দ্রুত বাড়বে।

