মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) স্পট মার্কেটে প্রতিযোগিতা কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে, আর এই সুযোগে গুটিকয়েক আন্তর্জাতিক কোম্পানির হাতে চলে গেছে বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলারের এলএনজি বাণিজ্যের বড় অংশ।
সাম্প্রতিক ছয় মাসে দেশের কেনা মোট চৌত্রিশ কার্গো এলএনজির মধ্যে একত্রিশটিই সরবরাহ করেছে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান, যার ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যসূচকের চেয়ে বেশি দামে কার্গো কিনতে গিয়ে প্রতি চালানে গড়ে চল্লিশ লাখ ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
এই বাড়তি আর্থিক ক্ষতি ঠেকাতে এবং কার্যত একচেটিয়া হয়ে যাওয়া বাজার কাঠামো ভাঙতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্তত পাঁচটি নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করার পথে হাঁটছে সরকার।
এদিকে দীর্ঘ প্রায় দেড় মাসের গ্যাস সংকট কাটিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে সরবরাহ আরও বিশ থেকে পঁচিশ কোটি ঘনফুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। তবে কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকায় এই বাড়তি গ্যাসের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে নিতে ইতিমধ্যে তদবির শুরু করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে কেনা চৌত্রিশ কার্গো এলএনজির সরবরাহ হয়েছে মূলত হাতেগোনা কয়েকটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির মাধ্যমে, যাদের মধ্যে একটি ফরাসি প্রতিষ্ঠানই সরবরাহ করেছে সর্বোচ্চ সংখ্যক কার্গো। এই সময়ে স্পট ও চুক্তির আওতায় এলএনজি কেনা বাবদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ২৬৮ মিলিয়ন ডলার।
তালিকাভুক্ত প্রায় ত্রিশটি কোম্পানি থাকলেও দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিকাংশ কোম্পানির প্রয়োজনীয় সরবরাহ সক্ষমতা নেই, আবার অতীতে বকেয়া বিল পরিশোধে দেরি হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেও অনেকে দরপত্রে অংশ নিতে অনাগ্রহী। এই সীমিত প্রতিযোগিতার সুযোগেই আন্তর্জাতিক মূল্যসূচকের তুলনায় প্রতি ইউনিটে এক থেকে দুই ডলার বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক একটি দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দামও আন্তর্জাতিক সূচকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি ছিল, যার ফলে একটি কার্গোতেই সরকারকে নব্বই লাখ ডলারের বেশি বাড়তি গুনতে হয়। এমন মাত্রাতিরিক্ত দামের কারণে সম্প্রতি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অক্টোবরের জন্য প্রস্তাবিত দুটি কার্গোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
তবে আশার কথা হলো, স্পট মার্কেটে বেশি দাম নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানই স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে সামান্য প্রিমিয়ামে আঠারোটি কার্গো সরবরাহে রাজি হয়েছে, যার ফলে সরকার এখন ধীরে ধীরে স্পট মার্কেট থেকে সরে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক ক্রয়ের দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে সাতটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের এ ধরনের চুক্তি বহাল থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কিছু সরবরাহকারী দেশ প্রতিশ্রুত সরবরাহ নিয়মিত রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই আরেকটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, এরপর আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত আমদানির সূচি নির্ধারিত আছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক আড়াইশ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে এলএনজি থেকে। একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত সংখ্যক আন্তর্জাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

