চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কর্ণফুলী ইপিজেড) দুই দশক পূর্ণ করেছে। এই সময়ে অঞ্চলটি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি করতে সক্ষম হয়েছে।
২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী ইপিজেড। পরের বছর ২০০৭ সালের নভেম্বরে পায়োলি ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের মাধ্যমে এখান থেকে প্রথম পণ্য রপ্তানি হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৮৬ লাখ ডলার। চলতি বছরের আগস্ট শেষে গত দুই দশকে এ অঞ্চলের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, আসবাব, ব্যাগ, অন্তর্বাস, ফ্যাশন পোশাক ও নিরাপত্তা পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ড ও ক্রয়প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব পণ্য যাচ্ছে।
শনিবার কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের পরিবর্তন ও অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। একসময় যেখানে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস (সিএসএম) ছিল, সেই জমিতেই গড়ে উঠেছে বর্তমান কর্ণফুলী ইপিজেড।
স্টিল মিলের পতন থেকে নতুন শিল্পাঞ্চল
কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ছিল চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে কারখানাটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, পুরোনো প্রযুক্তি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যায় প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বাড়তে থাকে।
১৯৯৮ সালে কারখানাটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা বাবদ প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পরে ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই চট্টগ্রাম স্টিল মিলস লিমিটেডের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং একসময় হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এলাকাটি অনেকটা নীরব হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জমিতে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেন।
এরপর বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে সেখানে নতুন করে শিল্পায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৪ সালে দুই ধাপে স্টিল মিলের জমি বেপজার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে ৭৪ একর এবং ২০ ডিসেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ১৪৮ দশমিক ৪২ একর জমি হস্তান্তর করা হয়।
পরিত্যক্ত শিল্পকারখানার জায়গায় শুরু হয় নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণ। পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে তৈরি করা হয় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল। গড়ে ওঠে কর্ণফুলী ইপিজেড—যেখানে আধুনিক অবকাঠামো, কারখানা ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।
বিনিয়োগ বেড়েছে ৪১ গুণ
২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কর্ণফুলী ইপিজেডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে এই অঞ্চলে। এর মধ্যে চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীরাও রয়েছেন।
২০০৬-০৭ অর্থবছরে কর্ণফুলী ইপিজেডে প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে মোট বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
ইপিজেডে মোট ২৫৮টি শিল্প প্লট রয়েছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন ২ হাজার বর্গমিটার। পাশাপাশি পাঁচটি মানসম্মত কারখানা ভবনে মোট ৪৯ হাজার ৭৯৮ বর্গমিটার জায়গা রয়েছে।
বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে ৪০টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর মধ্যে ২৯টি পুরোপুরি বিদেশি মালিকানাধীন, তিনটি যৌথ মালিকানার এবং আটটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজ চলছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডে বর্তমানে সরাসরি প্রায় ৮০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর বাইরে পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পাঞ্চল থেকে আধুনিক রপ্তানিমুখী শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের এই যাত্রায় কর্ণফুলী ইপিজেড এখন বাংলাদেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

