রাজধানীর মতিঝিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এই বৈঠকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি চালিকাশক্তি হিসেবে চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও হালকা প্রকৌশল খাতকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জার্মানির বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা চায় সরকার। শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-জার্মানি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার; বরং পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন, মানোন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার সুযোগ রয়েছে।
জার্মানি কেন এই তিন খাতে গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জার্মানির প্রযুক্তিগত দক্ষতা, দুইয়েরই সমন্বয়। তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, একই ধরনের সাফল্য চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও হালকা প্রকৌশল খাতেও অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন শিল্পমন্ত্রী। কিন্তু এজন্য আন্তর্জাতিক মান, কমপ্লায়েন্স, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর জোর দিতে হবে। জার্মানির অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেই মনে করছে সরকার।
চামড়া খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দুই-ই কম নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১২৩ কোটি ডলার, যা দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। চামড়া খাত হলো তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় খাত, যা এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় এনে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এখনো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের চামড়া কিনতে অনীহা দেখাচ্ছে। শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, পানির ব্যবহার কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে এ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব এবং এখানেই জার্মান প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে।
জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনার দুয়ার। এই খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই করছে না, একইসঙ্গে দেশের ইস্পাত, নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এরই মধ্যে ডেনমার্কের শিপিং জায়ান্ট ম্যাকেরস্ক বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার খাতে সরাসরি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে শিল্পমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে এ খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। জার্মানির অভিজ্ঞতা এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে, কারণ জার্মানির জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে।
হালকা প্রকৌশল খাত হলো সেই খাত, যা তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি ফ্রন্টিয়ার হওয়ার কথা ছিল। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি হালকা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় তিন লাখ দক্ষ শ্রমিক কাজ করছেন। এই খাত জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে এবং দেশের ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই খাতটি এখনো রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে আসলে এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই, যেখানে জার্মান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা একটি বড় সুযোগ হতে পারে।
জার্মান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের শিল্পখাতের অগ্রগতি ও সম্ভাবনার প্রশংসা করেছেন এবং চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহারসহ সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতা আরও বাড়াতে জার্মানির আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পখাতে অংশীদারত্ব এবং উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক সফর বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, কারণ জার্মানি ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি বড় বাজার। জার্মান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি যদি এই তিন খাতে আসে, তাহলে তা কেবল রপ্তানি আয় বাড়াবে না বরং কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

