সরকারের ইউরিয়া সার আমদানি প্রক্রিয়ায় এবার প্রথমবারের মতো যুক্ত হতে যাচ্ছে দুটি বেসরকারি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক। এই দুই ব্যাংকের মাধ্যমে সার আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য মোট এক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি চেয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ বিভাগে পাঠানো এক প্রস্তাবে বিসিআইসি সুপারিশ করেছে, ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক, প্রতিটির অনুকূলে পাঁচশ কোটি টাকা করে গ্যারান্টি দেওয়া হোক। বিসিআইসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের ফলে সার আমদানির নতুন একটি পথ খুলবে, যদিও এখনো বেশিরভাগ আমদানি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেই চলবে। অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যারান্টি অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে এবং শিগগিরই তা সম্পন্ন হবে। তাঁর ভাষ্য, যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমেই আমদানির সুযোগ থাকায় বেসরকারি ব্যাংক যুক্ত করায় নীতিগত কোনো বাধা নেই, বরং প্রস্তাবিত দুই ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো হওয়ায় সরকার এই সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছে।
এতদিন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক— এই চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেই সার আমদানির এলসি খোলা হতো।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিসিআইসি নিজেই পুরোনো সার আমদানির ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে তাদের বকেয়ার পরিমাণ ছাড়িয়েছে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ না হলে তা খেলাপি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এবং খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো নতুন এলসি খুলতে পারবে না— যা আগামী অর্থবছরের বার লাখ টন ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্যমাত্রাকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় একদিকে নতুন ব্যাংক যুক্ত করে আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর আগেও ২০২৪ সালের শুরুতে সার আমদানির বকেয়া মেটাতে সরকারকে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের অনুকূলে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের বিশেষ বন্ড ইস্যু করতে হয়েছিল।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ বিভাগের এক সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমেও সার আমদানির এলসি খোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপরই ব্র্যাক ও প্রাইম ব্যাংক সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে বিসিআইসিকে চিঠি দেয়।
ব্র্যাক ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, এই উদ্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়, বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয় প্রক্রিয়া আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করার একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। তাঁর দাবি, তাদের ব্যাংক এখন দেশের জ্বালানি ও সার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রধান ব্যাংকিং সহযোগী হয়ে উঠেছে, যা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ইউরিয়া আমদানির বিপরীতে ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া পুরোনো ও নতুন ঋণ মিলিয়ে মোট দায়ের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ষোলো হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ইতিমধ্যে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি রয়ে গেছে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, যা নির্ধারিত সময়ে মেটানো না গেলে পুরো ঋণ ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্পোরেশন।
বিসিআইসি সাধারণত পোস্ট-ইমপোর্ট ফাইন্যান্সিং সুবিধার আওতায় সার আমদানি করে, যেখানে ব্যাংক প্রথমে আমদানি মূল্য পরিশোধ করে এবং বিসিআইসিকে ১৮০ দিনের মধ্যে তা ফেরত দিতে হয়। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকির অর্থ ছাড় পেতে দীর্ঘসূত্রতা হওয়ায় এই সময়সীমার মধ্যে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে বিসিআইসি ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ সম্মত হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। তবে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সরকারি গ্যারান্টির মেয়াদও একই সঙ্গে দুই বছর বাড়ানো হলেই তারা এই প্রস্তাবে সম্মত হবে। অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সেই অনুযায়ী গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে, কারণ কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সার আমদানি নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
বর্তমানে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনুকূলে সার আমদানির জন্য মোট সাড়ে সতেরো হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া আছে, যার মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এখন এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ব্র্যাক ও প্রাইম ব্যাংকের জন্য প্রস্তাবিত এক হাজার কোটি টাকা। এই গ্যারান্টির অর্থ হলো, বিসিআইসি আমদানি মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে নির্ধারিত শর্তে সরকার সেই দায় বহন করবে।
দেশের চাহিদা মেটাতে বিসিআইসি প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ ইউরিয়া আমদানি করে, পাশাপাশি নিজস্ব কারখানায়ও উৎপাদন করে। কিন্তু কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদন কমছে, ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সার আমদানির প্রয়োজন হতে পারে।
দেশে বছরে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় সাড়ে ছাব্বিশ থেকে সাতাশ লাখ টন, যার একটি অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় আর বাকিটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরেও একাধিক ধাপে সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
সরকার সংসদে জানিয়েছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং চাহিদা মেটানোর পরও উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা অভিযোগ করছেন, সরকার-নির্ধারিত দামে চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনছেন। কিছু এলাকায় এই সংকট নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ এবং ডিলারদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার এই সমস্যাকে মূলত সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, বহু ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে, এবং কিছু অসাধু ডিলারের কারসাজিও কৃত্রিম সংকট তৈরির একটি কারণ বলে মনে করছে প্রশাসন। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন ডিলার নিয়োগ ও দেশব্যাপী মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সার আমদানিতে বেসরকারি ব্যাংক যুক্ত করার এই উদ্যোগ কেবল অর্থায়নের নতুন উৎস খোঁজার বিষয় নয়— বরং এটি বিসিআইসির দীর্ঘদিনের ঋণ জর্জরিত অবস্থা, ভর্তুকি ছাড়ে বিলম্ব এবং ভবিষ্যতের আমদানি প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা। তবে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে বণ্টন ব্যবস্থার দুর্বলতা কৃষকদের প্রকৃত সমস্যা— যা কেবল আমদানি অর্থায়ন বাড়িয়ে সমাধান করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

