দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের বাজারে সরাসরি সংযোগ ঘটাতে রাজধানীতে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ‘বিসিক চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য মেলা-২০২৬’। গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তেজগাঁওয়ের বিসিক ভবনে মেলার উদ্বোধন করেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কবির রিজভী। মেলাটি চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলায় মোট ৪৯টি স্টলের মধ্যে ৪৩টি স্টলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রয় করছেন। বাকি পাঁচটি স্টলে খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্যের উদ্যোক্তারা অংশ নিয়েছেন।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় জরুরি। বয়ন, রং করা, জুতা তৈরি ও কারুশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্প একসময় গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বিশেষভাবে বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করে সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। প্রতিবছর কুরবানি ঈদে যে চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করতেই হিমশিম খেতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে জুতার কারখানা তৈরি করতে পারলে শতভাগ জুতা রপ্তানি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
চামড়া শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা ট্যানারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শিল্প উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, ট্যানারি থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য নদী, খাল-বিল ও পরিবেশে যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্জ্য থেকে রাসায়নিক আলাদা করে পানি পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সরকারের নীতি এমন হওয়া উচিত যেখানে ট্যানারির আশেপাশে বসতি গড়ে উঠবে না। বিসিকের বিভিন্ন শিল্পনগরীর অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কারখানা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং কর্মসংস্থান বাড়ে।
দেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে হাজারীবাগ কেন্দ্রিক ছিল। ২০১৭ সালে ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারের ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই স্থানান্তরের সুফল মেলেনি। সাভার শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারিগুলো লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। এই সনদ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখায় না।
এলডব্লিউজি সনদের অভাব সরাসরি রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের বড় ক্রেতা। এখন চীন ছাড়া বড় বাজার নেই। অথচ চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে কম দামে চামড়া কিনে এলডব্লিউজি সনদের সুবিধা নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বর্তমানে দেশের মাত্র চারটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে, যার কোনোটিই সাভার শিল্পনগরীর ভেতরে নয়।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বেশি, কিন্তু অর্জন তার তুলনায় কম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় এক দশক পরেও রপ্তানি আয় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্বে চামড়ার বাজার প্রায় ৫৬ হাজার কোটি ডলারের। সেই হিসাবে বাংলাদেশ মাত্র এক শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও বছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব ছিল। কিন্তু পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সিইটিপির অকার্যকারিতা, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত দুর্বলতায় শিল্পটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ জানিয়েছেন, দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের উন্নয়ন, উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিসিক নকশা কেন্দ্র থেকে চামড়াজাত পণ্যের ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তারাও অংশ নিয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী হাজারীবাগের উদ্যোক্তারাও মেলায় তাদের পণ্য প্রদর্শন করছেন। প্রথম দিনেই মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ক্রেতা এসেছেন এবং বেচাকেনাও ভালো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিসিকের এই মেলা শুধু পণ্য প্রদর্শনীর মঞ্চ নয় বরং দেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

