দেশের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে বড় ধরনের সংস্কার আসছে। সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানির কর্মীরা সরাসরি সরকারি পেনশন সুবিধা পান না, তাদের এবার সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালু, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নমিনির সুবিধার বয়সসীমা বাড়ানো এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক কর্মী প্রথমবারের মতো একটি সুসংগঠিত পেনশন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর যেসব কর্মী সরকারের সরাসরি পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের প্রগতি স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মীর অবসর-সুবিধা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির চাকরি বিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে; তারা সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো রাষ্ট্রীয় পেনশন পান না। প্রগতি স্কিম মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত, যেখানে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ বহন করেন কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। এর ফলে সরকারি কোম্পানির কর্মীরা একটি নিয়মিত ও সুসংগঠিত পেনশন কাঠামোর সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন কোন কোম্পানির কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন, তার পূর্ণ তালিকা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পর্ষদ। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থার জন্য আলাদা বিধিমালা করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী চেয়ারম্যান। অন্যদিকে পেনশনভোগী মারা গেলে তার নমিনির পেনশন সুবিধা পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ড. সুরাতুজ্জামান জানান, পেনশনভোগীর স্বামী বা স্ত্রী পেনশনভোগীর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। এছাড়া পাঁচ বছর পর টাকা তুলে বের হওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং প্রস্তাবটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সর্বজনীন পেনশন তহবিলে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হয়েছিল। ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন পাওয়ার প্রস্তাবটি অ্যাকচুয়ারিয়াল পরামর্শ নিয়ে চূড়ান্ত করা হবে। স্পেনে ৬৭ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৬৬ বছর বয়স থেকে পেনশন সুবিধা দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, তাই ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবটি আর্থিক ও জনমিতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে পর্যালোচনা করা হবে।
প্রবাসীদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশে যাওয়ার সময়ই তাদের এই কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হবে এবং এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাজ করবে। এছাড়া পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিগুলোর অন্তর্ভুক্তির এককালীন ফি ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পেনশন তহবিল বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্মের মাধ্যমে অডিট করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। পাশাপাশি পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে এবং কোন মডেলে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হবে এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব বা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে বর্তমানে প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস, এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে প্রচারের ঘাটতি, আস্থার সংকট এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই স্কিমে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। সরকারি কোম্পানির কর্মীদের প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালু করার মতো উদ্যোগ এই কর্মসূচিকে আরও গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সহায়ক হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত চার কোটি পরিবারের একজন করে সদস্যকে এই পেনশনের আওতায় আনা। সেই লক্ষ্য পূরণে এই সংস্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তগুলো দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষের অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্তগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং এর সুফল কতটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছায়।

