বিশ্ববাজারে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকট ও ডলারের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের শক্তি খাতকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেন্দ্রিক করার পেছনের সিদ্ধান্ত এবং এর টেকসই সমাধান নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘দ্য জ্বালানি পডকাস্ট’-এর সাম্প্রতিক একটি পর্বে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী।
পডকাস্টে প্রদত্ত তথ্য ও বিশ্লেষণে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশকে যেখানে বাংলাদেশে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হতো, সেখানে ২০১০ পরবর্তী সময়ে দেশের নিজস্ব গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার একধরনের ন্যারেটিভ বা প্রচার তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে দেশে অবকাঠামো তৈরি ও এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা কালক্রমে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ ব্যয়বহুল আমদানি নির্ভরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
আমদানি খরচ ও ভর্তুকির পরিসংখ্যান
পডকাস্টে দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে তৈরি দুটি এলএনজি টার্মিনালের নির্মাণের তুলনায় গত আট বছরে টার্মিনালগুলোর পেছনে সরকারের ভর্তুকি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত মোট গ্যাসের একটি বড় অংশ এলএনজি হিসেবে বিদেশ থেকে ডলারের মাধ্যমে আমদানি করতে হচ্ছে, যা জাতীয় কোষাগার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
একই সাথে পডকাস্টের আলোচনায় উঠে আসে যে, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসভিত্তিক বয়লারগুলোর একটি বড় অংশ অত্যন্ত কম কার্যক্ষমতায় চালিত হওয়ার কারণে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ ও বিকল্প ভাবনার পথ
এলএনজি আমদানির এই ব্যয়বহুল চক্র থেকে বের হয়ে আসার জন্য পডকাস্টে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ ও কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়।
-
ছাদভিত্তিক সোলার): বাংলাদেশে একটি বড় অংশের পরিবার নিজেদের মালিকানাধীন নিজস্ব বাসাবাড়িতে বাস করে। পডকাস্টে উল্লেখ করা হয়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ছাদে ছোট আকারের (যেমন: ৩ কিলোওয়াট) সৌর প্যানেল বসাতে উৎসাহিত করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
-
কৃষি ও ভাসমান প্রযুক্তি: জমি সংকটের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে অব্যবহৃত খাস জমি, বাণিজ্যিক মাছ চাষের আওতামুক্ত জলাশয়ে ভাসমান সোলার এবং সবজি চাষের জমিতে সমন্বিত সোলার স্থাপনের মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের উদ্যোগের সুযোগ বাংলাদেশে রয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিগত সংস্কার
পডকাস্টে আলোচনা চলাকালে জ্বালানি খাতকে টেকসই করার লক্ষ্যে কয়েকটি জরুরি নীতিগত উদ্যোগের সুপারিশ করা হয়:
১. পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সুবিধা বৃদ্ধি ও পেট্রোল পাম্পগুলোতে চার্জিং পয়েন্ট সহজতর করা।
২. কৃষি সেচ পাম্পগুলোকে সোলারে রূপান্তরের জন্য কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করা।
৩. বাসাবাড়িতে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ করার বিপরীতে নাগরিকদের আর্থিক সুবিধা প্রদান।
৪. শিল্পখাতের গ্যাস চালিত বয়লারগুলোকে আধুনিক ও বিদ্যুৎভিত্তিক করার জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা।
প্রতিবেদনটি ‘দ্য জ্বালানি পডকাস্ট’-এ প্রকাশিত হাসান মেহেদীর দেওয়া বক্তব্য ও পরিবেশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

