বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দেওয়ার বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পায়রা বন্দর। পরিকল্পনা ছিল, এই বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন শিল্পাঞ্চল, বাড়বে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, তৈরি হবে কর্মসংস্থান এবং দেশের সমুদ্র বাণিজ্যে নতুন একটি শক্তিশালী কেন্দ্র তৈরি হবে।
কিন্তু উদ্বোধনের ১৩ বছর পরও সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পায়রা বন্দরের কার্যক্রম এখনো সীমিত পর্যায়ে আটকে আছে। বন্দরের বিশাল অবকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও সেখানে নেই প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক ব্যস্ততা।
গত ১৩ বছরে পায়রা বন্দরের উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। অথচ বর্তমানে বন্দরটি মূলত একটি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং রপ্তানি কার্যক্রম এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় শুরু হয়নি।
পটুয়াখালীর তিয়াখালী এলাকার ধানক্ষেত ও কাদামাটির মধ্যে ২০১৩ সালে যখন পায়রা বন্দরের যাত্রা শুরু হয়, তখন এটিকে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল। পরিকল্পনায় ছিল ১৭টি বড় প্রকল্প, যেখানে নতুন জেটি, শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আধুনিক নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল।
লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো বাস্তব রূপ পায়নি।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বন্দরের প্রশাসনিক ভবন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পণ্য ওঠানামার সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু সেখানে বাণিজ্যিক ব্যস্ততার চিত্র খুবই সীমিত। বন্দরের আশপাশে বড় বড় জাহাজের পরিবর্তে দেখা যায় ছোট নৌযান। খালি পড়ে থাকে জেটি ও পণ্য রাখার জায়গা।
পরিসংখ্যানও বলছে, বন্দরের ব্যবহার এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে মোট ২ হাজার ৯৬২টি জাহাজ এসেছে। তবে এর মধ্যে বিদেশি জাহাজ ছিল মাত্র ২৯টি।
এই সময়ে বন্দর দিয়ে ৫৫ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা। এর বাইরে পাথর ও সিমেন্টের মতো কিছু পণ্য এসেছে। কিন্তু রপ্তানি কার্যক্রম ছিল প্রায় নেই বললেই চলে।
অর্থাৎ, বন্দরের মূল উদ্দেশ্য যেখানে ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় কেন্দ্র তৈরি করা, সেখানে বর্তমানে এটি অনেকটাই সীমিত পণ্য পরিবহনের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
পায়রা বন্দরের সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীপথের গভীরতা
পায়রা বন্দরের সবচেয়ে বড় বাধা লুকিয়ে আছে এর নৌপথে। বন্দরের প্রধান প্রবেশপথ রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রয়োজনীয় গভীরতা না থাকায় বড় জাহাজ সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না।
বন্দরকে কার্যকর রাখতে চ্যানেল খননে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে।
পরিকল্পনা ছিল, নিয়মিত খননের মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার রাখা হবে, যাতে বড় আকারের জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বর্ষাকালে অনেক সময় চ্যানেলের গভীরতা নেমে আসে ৫ থেকে ৬ মিটারে।
ফলে বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরে আসতে পারে না। মাঝপথে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে।
এই সমস্যার কারণে অনেক ব্যবসায়ী পায়রা বন্দর ব্যবহার থেকে পিছিয়ে গেছেন। পাথর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মদিনা ট্রেডিং করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, চ্যানেলের অগভীরতার কারণে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা বিকল্প পথ ব্যবহার শুরু করেছেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, স্থায়ীভাবে নৌপথের গভীরতা নিশ্চিত না হলে পায়রা বন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
অবকাঠামো আছে, কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ
পায়রা বন্দরে রয়েছে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি, ৩ লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটার আয়তনের পণ্য সংরক্ষণ এলাকা এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। একসঙ্গে ১৫টি জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়েও তৈরি করা হয়েছে এই অবকাঠামো।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সুবিধা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
বন্দরের তালিকাভুক্ত অনেক শিপিং এজেন্টের স্থানীয় ঠিকানায় গিয়ে তাদের কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই একটি বন্দর সফল হয় না; প্রয়োজন হয় শিল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এতে অনেক মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়েছেন, কিন্তু এখনো তারা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাননি।
তার মতে, বন্দরের আশপাশে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি না হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
আশার জায়গা এখনো রয়েছে
তবে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দীর্ঘদিনের নৌ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, পায়রা বন্দরের জেটি দেশের অন্যান্য বন্দরের তুলনায় বড়। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হতে পারে।
এর মধ্যে আন্দারমানিক নদীর ওপর নির্মাণাধীন চার লেনের সেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ ৯৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। এটি আগামী নভেম্বর মাসে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সেতু পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনালকে নতুন ছয় লেনের সড়কের সঙ্গে যুক্ত করবে, যা ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ শাইফ-উল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বন্দরটি মূলত কয়লা পরিবহনের ওপর নির্ভর করলেও ভবিষ্যতে বরিশাল অঞ্চলের তৈরি পণ্য রপ্তানির জন্য এটি প্রস্তুত রয়েছে।
তবে এজন্য নিয়মিত চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ, আশপাশে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ঢাকার সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তার মতে, পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল চালু হলে এবং নতুন শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে বন্দরের কার্যক্রম বাড়তে পারে।
পায়রা বন্দরের জন্য ছয়টি টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বহুমুখী টার্মিনাল বর্তমানে প্রস্তুত। অন্য টার্মিনালগুলোর নির্মাণকাজ আগামী দুই বছরের মধ্যে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল এবং ভবিষ্যতে রেল ও বিমান যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, পায়রা বন্দরের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো তৈরি নয়, বরং সেই অবকাঠামোকে কার্যকর বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত করা।
হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর একটি বন্দর শুধু কংক্রিটের স্থাপনা হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিকারের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে—তা নির্ভর করবে এখনকার সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর।

