বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটছে না। নানা নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার পরও জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতির চিত্রই উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ২০০৩ সালে এই হিসাব চালুর পর সর্বনিম্ন। জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও অত্যন্ত দুর্বল। মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ও বিভিন্ন ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, আগের বিভিন্ন আর্থিক সংকটের সময়ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এতটা কমে যেতে দেখা যায়নি।
ঋণপ্রবাহের এই ধীরগতির পেছনে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দিতে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, ঋণের উচ্চ খরচ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ব্যাংক ও ব্যবসা উভয় পক্ষই চাপে রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই কর্মসূচির আওতায় ঋণ নেওয়ার আগ্রহ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ কমাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নীতিও চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ডলারের সরবরাহ বাড়াতেও কিছু নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
এর প্রভাব পড়ছে শিল্প ও বিনিয়োগেও। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন ও কারখানা সম্প্রসারণে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। অনেক কারখানাই দুর্বল চাহিদা ও চলতি মূলধনের সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান তৈরির গতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা বা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন সমস্যাগ্রস্ত সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের সংস্থান রাখতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমার পাশাপাশি নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্বল চাহিদা ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান খারাপ হওয়ায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়ছে। ফলে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিক থেকেই বেসরকারি ঋণপ্রবাহ বাধার মুখে পড়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তা দ্রুত কমতে থাকে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও ঋণের এই ধীরগতির কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের দুর্বল চাহিদা, ঋণের উচ্চ খরচ, ব্যাংকগুলোর সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগের প্রবণতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ব্যাংকগুলো এখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করছে। খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এবং সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ চাহিদা—দুই কারণেই ব্যাংকগুলোর এ ধরনের প্রবণতা বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য কতটা উন্নত হয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগে কত দ্রুত গতি ফেরে তার ওপর।
এদিকে ঋণের খরচও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ এখনও প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য এই উচ্চ সুদে নতুন ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একদিকে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দুর্বল ঋণচাহিদা ও উচ্চ সুদ—সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক না হলে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোও কঠিন হতে পারে।

