দেশের অবকাঠামো, শিল্প, আবাসন ও ভূমি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় আনতে ৩০ বছরের জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা (এনএসপি) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০২৬ থেকে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হবে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি) ৪৬৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, তিন বছরের মধ্যে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ করা।
এই জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশের পুরো ভূখণ্ডের পাশাপাশি ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় আনাই মূল লক্ষ্য
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা আলাদাভাবে তৈরি করা হয়। ফলে সড়ক, রেল, শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে যায়।
একজন ইউডিডি পরিকল্পনাবিদ বলেন, বাংলাদেশে সড়ক ও রেল প্রকল্প সাধারণত আলাদা পরিকল্পনায় এগোয়। জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব উন্নয়ন কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে।
এই পরিকল্পনায় কোথায় শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, কোথায় আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণ করা হবে এবং ভবিষ্যতের রেল ও মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক কোন পথে যাবে—এসব বিষয় নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
তবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপর। যেমন সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।
পাঁচ বছর পরপর হবে পর্যালোচনা
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ ও প্রযুক্তির পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রতি পাঁচ বছর পর পর পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে।
প্রথম পর্যায়ে পরিকল্পনাটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিলেও পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে এটি যুক্ত করা হবে।
কেন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০০১ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৩.৩ শতাংশ শহরে বসবাস করত। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৩১.৬৬ শতাংশ হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের শহুরে জনসংখ্যা ৩৮.২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশ আসে শহরাঞ্চল থেকে। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সুশৃঙ্খল শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়ছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। এ জন্য বিভিন্ন শহরকে শ্রেণিবিন্যাস করে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ও অভিবাসন উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিজমি রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্ব
জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনায় কৃষিজমি সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন, পরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কৃষি শুমারি ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ০.১৯ শতাংশ কৃষিজমি কমছে। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষির জন্য উপযোগী অঞ্চল চিহ্নিত করা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন উপযোগী হবে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।
আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে
পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬ গত ৮ এপ্রিল পাস করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা দ্রুত তৈরি ও বাস্তবায়ন করা গেলে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তার মতে, একটি সমন্বিত কাঠামো থাকলে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সময়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থানিক পরিকল্পনা উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকির ওপর।

