গত প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় রুপির বিপরীতে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশি টাকা। একসময় ১০০ ভারতীয় রুপি কিনতে যেখানে প্রায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১২৭ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে। গত ২১ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ১ ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ছিল প্রায় ১ টাকা ২৭ পয়সা। অর্থাৎ, একই পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা নিয়ে এখন আগের তুলনায় বেশি ভারতীয় রুপি পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন ভারতগামী বাংলাদেশিরা; বিশেষ করে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশি টাকার এই শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত গোলাম মওলার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য ও পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
এক বছরে বদলে যাওয়া হিসাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১ ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ছিল প্রায় ১ টাকা ৩৭ থেকে ১ টাকা ৪০ পয়সার মধ্যে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে আসে প্রায় ১ টাকা ৩৪ থেকে ৩৬ পয়সায়। আর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তা আরও নেমে এসেছে প্রায় ১ টাকা ২৭ পয়সায়। এই পরিবর্তনকে সহজভাবে বোঝা যায় একটি উদাহরণে। কেউ ভারতে গিয়ে ১ লাখ রুপি খরচ করলে, প্রতি রুপি ১ টাকা ৪০ পয়সা দরে তার প্রয়োজন হতো প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এখন ১ টাকা ২৭ পয়সা হিসাবে একই ১ লাখ রুপি কিনতে লাগবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ব্যবধান প্রায় ১৩ হাজার টাকা। তবে বাস্তবে ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ বা কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রয়-বিক্রয় ব্যবধান, কমিশন ও অন্যান্য চার্জ থাকায় বাজারের ঘোষিত হার আর প্রকৃত খরচ এক নাও হতে পারে।
কেন এমন হলো: দুই মুদ্রার আপেক্ষিক শক্তির খেলা
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু বাংলাদেশের টাকার শক্তিশালী হওয়া কাজ করছে না, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় রুপির দুর্বলতাও বড় একটি কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জানুয়ারি ২০২৬-এর শেষ দিকে ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে আগের অর্থবছরের জুনের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ দুর্বল হয়েছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের টাকা ডলারের বিপরীতে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ফলে দুই দেশের মুদ্রার পারস্পরিক বিনিময় হারে বাংলাদেশের টাকা সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখেও ভারতীয় রুপি ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯৫ দশমিক ৮২ রুপিতে লেনদেন শেষ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, রিজার্ভও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগস্টের প্রথম ২৯ দিনেই এসেছে ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। রিজার্ভও বেড়েছে; আগস্ট ২০২৬ শেষে মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
সবচেয়ে বেশি স্বস্তি চিকিৎসা ও পড়াশোনায়
ভারতে বাংলাদেশিদের যাতায়াতের বড় একটি কারণ চিকিৎসা। কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, ভেলোর, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে যান। চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালের বিল নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, হোটেল, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াত; সবকিছুর জন্য ভারতীয় রুপি প্রয়োজন হয়। ফলে রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হলে পুরো ভ্রমণ ব্যয়ের ওপরই তার প্রভাব পড়ে। ধরুন, কোনও রোগী ও তার পরিবার চিকিৎসা ও অন্যান্য কাজে ২ লাখ রুপি খরচ করবেন। ১ রুপি ১ টাকা ৪০ পয়সা হলে শুধু মুদ্রা বিনিময়েই খরচ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একই ২ লাখ রুপি এখন ১ টাকা ২৭ পয়সা হিসাবে কিনতে প্রয়োজন প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ, বিনিময় হারের পার্থক্যেই প্রায় ২৬ হাজার টাকা কম লাগতে পারে। একইভাবে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, বাসা বা হোস্টেল ভাড়া এবং দৈনন্দিন ব্যয়ও কমতে পারে।
আমদানিকারকদের জন্যও সুযোগ
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। দেশটি থেকে শিল্পের কাঁচামাল, তুলা, সুতা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য আমদানি হয়। ভারতীয় রুপির বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হলে রুপিতে মূল্য নির্ধারিত পণ্যের আমদানি ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী সরাসরি রুপিতে লেনদেন করেন, তারা এর তাৎক্ষণিক সুবিধা পেতে পারেন। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সব আমদানি সরাসরি রুপিতে নিষ্পত্তি হয় না, অনেক লেনদেন ডলারভিত্তিক। ফলে রুপির বিপরীতে টাকার শক্তিশালী হওয়ার সুফল সব আমদানিতে একইভাবে পড়বে না। আবার আমদানি ব্যয় কমলেই বাজারে পণ্যের দাম একই হারে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ পণ্যের দামের সঙ্গে শুল্ক, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ এবং ব্যবসায়ীর মুনাফা যুক্ত থাকে।
যেটি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
রুপির বিপরীতে টাকার দাম বাড়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সব দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে গেছে। এটি মূলত দুই মুদ্রার পারস্পরিক বিনিময় হার। একটি মুদ্রা স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি অন্যটি দুর্বল হলেও আপেক্ষিকভাবে প্রথম মুদ্রা শক্তিশালী দেখাতে পারে। বাংলাদেশের টাকা আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে। এতে কিছু পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি ভারতীয় পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে গেলে সেসব পণ্যের আমদানি বাড়তে পারে। এতে ভোক্তারা কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগ পেলেও দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারেন। তাই বিনিময় হার নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি আমদানি-রফতানির ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের মত: সুবিধা ও ঝুঁকি দুটোই আছে
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সহজভাবে বললে, বাংলাদেশি টাকার মান শক্তিশালী হলে এক টাকায় আগের তুলনায় বেশি ভারতীয় রুপি পাওয়া যায়। ফলে ভারতে ১০০ রুপি দামের কোনও পণ্য কিনতে আগে যে পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা প্রয়োজন হতো, এখন তার চেয়ে কম টাকা লাগবে। এতে ভারত থেকে পণ্য আমদানির প্রাথমিক খরচ কমার সুযোগ তৈরি হয়।’ তিনি বলেন, ‘ভারতীয় রুপির বিপরীতে টাকার মান শক্তিশালী হলে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতে চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভ্রমণের ব্যয়ও তুলনামূলক কমে আসে। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। বাংলাদেশি টাকা শক্তিশালী হলে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে যেতে পারে। এতে কিছু পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
সব মিলিয়ে, ভারতগামী বাংলাদেশিদের জন্য বর্তমান বিনিময় হার স্বস্তির। চিকিৎসা, পর্যটন, শিক্ষা ও কিছু ধরনের ব্যবসায় এর সরাসরি আর্থিক সুবিধা রয়েছে। তবে এই সুবিধা কতদিন থাকবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের মুদ্রার ভবিষ্যৎ গতিপথ, ডলারের আন্তর্জাতিক মূল্য, তেলের দাম, রেমিট্যান্স, রফতানি আয় এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতার ওপর। পাশাপাশি এই আপেক্ষিক শক্তিকে অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতার একক সূচক হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময় হার হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসঙ্গত হবে।
তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদনটি বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত গোলাম মওলার ‘রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের তথ্য ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। মূল প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিত, পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মতামতকে ভিত্তি ধরে এখানে সংবাদমূলক উপস্থাপনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব মূল লেখকের।

