বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বাড়তে থাকা লোকসান পুষিয়ে নিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। কিন্তু ঠিক উল্টো সময়ে এই সিদ্ধান্তটি এলো, যখন বিশ্বের বহু দেশ জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো, মূল্যসীমা নির্ধারণ কিংবা সরাসরি ভর্তুকির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার, যা বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা খরচ হবে। একদিকে বেতন বাড়ানোর বাড়তি ব্যয়, অন্যদিকে জ্বালানি খাতে কর ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত; এই দুইয়ের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। টিবিএস-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই বিতর্কের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে, যার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি।
বিশ্বজুড়ে কর ছাড়, বাংলাদেশে ভিন্ন চিত্র
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর অন্তত ৫৫টি দেশ ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে সরাসরি রাজস্ব নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী ভারত পেট্রোলের বিশেষ আবগারি শুল্ক ১৩ রুপি থেকে কমিয়ে ৩ রুপি এবং ডিজেলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে শুল্ক তুলে দিয়েছে। পাকিস্তান জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও মোটরসাইকেল আরোহী, কৃষি ও পরিবহন খাতের মতো নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দিয়েছে; যেখানে ৭৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করে ১০০ রুপি প্রতি লিটারে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত জ্বালানির ওপর পরিবেশ সুরক্ষা কর, ভ্যাট ও বিশেষ ভোগ কর শূন্য করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া পেট্রোলে ১৫ শতাংশ এবং ডিজেল ও এলপিজিতে ২৫ শতাংশ কর ছাড়ের মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই প্রবণতার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের আমদানিমূল্যের ওপর সরাসরি প্রায় ৩২ শতাংশ সঞ্চিত শুল্ক ও কর ধার্য করা হয়।
বিপিসির লোকসান বনাম মুনাফার হিসাব
সরকারের যুক্তি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে, যা সমন্বয় না করায় মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তবে বিপিসির হিসাব বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে বিপিসি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাই-স্পিড ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন এবং এলপিজিসহ নয় ধরনের জ্বালানি তেল থেকে সরকার ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি তেল ও এলপিজি থেকে অর্জিত রাজস্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯০ শতাংশ। কর সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে ট্যারিফ ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক-কর গণনা করা হতো, কিন্তু এখন ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে করা হচ্ছে, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে রাজস্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ও ক্যাবের সমালোচনা
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন টিবিএসকে বলেন, ‘অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে যেসব সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলো সম্প্রসারণ করার আর্থিক সক্ষমতাও এখন সরকারের নেই। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু করায় সেখানেও টান পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা দেখা যাচ্ছে না।’ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এবং ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন এম শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার একদিকে ভ্যাট-ট্যাক্সের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা নেয়, অন্যদিকে মুনাফাও করে। অথচ সরকারের এখানে মুনাফা করার কথা নয়। বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি তেলে সরকার অবিরাম মুনাফা করছে। এই সময়ে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে দাম কমানো হয়নি।’
অর্থনীতিতে বাড়তি চাপের আশঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই পরিবহন খাতে পড়তে শুরু করেছে। সরকার যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে, পণ্যবাহী ট্রাক ও নৌযানের ভাড়াও একই হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচকাজে বাড়তি ব্যয়ের প্রভাবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মুখে সরকারের কর ছাড়ে অনীহা এবং বেতন বাড়ানোর চাপ; এই দুইয়ের সমন্বয় কীভাবে সরকার করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এখন দেখার বিষয়; সরকার ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে ফিরে আসে কি না এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ কমাতে কোনো কর ছাড়ের পদক্ষেপ নেয় কি না।
তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদনটি টিবিএস-এ প্রকাশিত ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর মুখে জ্বালানির শুল্ক-কর ছাড় থেকে পিছু হটল সরকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। মূল প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ ও তথ্য এই প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি।

