দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, এটা সাধারণ অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু সম্প্রতি গ্যারেজে গাড়ি বা মোটরসাইকেল সার্ভিসিং করতে গিয়ে চালকরা এক অদ্ভুত ধাক্কা খাচ্ছেন। ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিকেন্টের দাম এতটাই বেড়েছে যে অনেকেই হিসাব মেলাতে পারছেন না। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক গভীর বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনের আসল কারণ। প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে চলতি বছর কিছু লুব্রিকেন্ট পণ্যের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে বেড়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই দাম বাড়ার পেছনে সরাসরি সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের কোনো হাত নেই। এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে হাজার মাইল দূরের মধ্যপ্রাচ্যে। ইরান সংঘাত, আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বিপর্যয় এবং কাঁচামাল পরিবহনের বাড়তি খরচ মিলে দেশের আট হাজার কোটি টাকার লুব্রিকেন্ট বাজারকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
ভেতরের রসায়ন ও বিশ্ববাজারের সমীকরণ
লুব্রিকেন্টের দাম কেন এতটা বাড়ছে, সেই সমীকরণ বুঝতে হলে এর ভেতরের রসায়নটা জানা জরুরি। একটি লুব্রিকেন্টের পঁচাত্তর থেকে আটানব্বই শতাংশই হলো বেস অয়েল এবং বাকি অংশে থাকে বিশেষ রাসায়নিক মিশ্রণ বা অ্যাডিটিভস। বাংলাদেশ এই বেস অয়েলের জন্য পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এমজেএল বাংলাদেশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, কাতারের পার্ল জিটিএলসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদন দেশগুলোতে সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সংকট শুরুর আগে যে বেস অয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯০০ ডলার, তা এখন বেড়ে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি উন্নত মানের সিনথেটিক বেস অয়েলের দাম টনপ্রতি তিন হাজার ২০০ ডলারও ছাড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ঘাটতির কারণে অনেক শোধনাগার এখন বেস অয়েলের বদলে সরাসরি ডিজেল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে, যা বাজারে এই কাঁচামালের তীব্র আকাল তৈরি করেছে।
নৌপথের বাড়তি ঝুঁকি ও ডলারের চাপ
কাঁচামালের এই চড়া দামের ওপর আরেক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় এবং ডলারের দাম। লুব্রিকেন্টস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। সংঘাতপূর্ণ এই নৌরুটে জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ফ্রেইট চার্জ এবং বীমা প্রিমিয়াম আদায় করছে। বিশ্ববাজার থেকে একটি পণ্য কিনে দেশে আনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি দেশীয় আমদানিকারকদের জন্য আরেক বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলার সংকট এবং ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলার জটিলতা। কাস্টমস ভ্যালুয়েশন নিয়ে থাকা অনিশ্চয়তাও আমদানি করা ফিনিশড লুব্রিকেন্ট ও কাঁচামালের চূড়ান্ত দামকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
খুচরা দোকানের চিত্র ও সাধারণের দীর্ঘশ্বাস
আন্তর্জাতিক বাজারের এই উত্তাপ খুব দ্রুতই রাজধানীর খুচরা দোকানগুলোতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে সাধারণ বিক্রেতা ও ক্রেতাদের চরম হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। খুচরা বাজারে মোবিল স্পেশালের চার লিটারের প্যাকের দাম দুই হাজার ৫০ টাকা থেকে বেড়ে দুই হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। মোবিল ফাইভডব্লিউ থার্টির দাম দুই হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে জাপানি সিভিটি এফই তেলের চার লিটারের প্যাক পাঁচ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাত হাজার টাকা হয়ে গেছে। বড় গাড়িই শুধু নয়, সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরাও লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি গুনছেন। জানুয়ারিতে যে ইঞ্জিন অয়েল ৮৫০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন কিনতে হচ্ছে এক হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে। খুচরা বিক্রেতারা আশঙ্কা করছেন, বেশি দামে কেনা নতুন লট যখন দোকানে ঢুকবে, তখন দামের পারদ হয়তো আরও এক দফা ওপরে উঠবে।
আট হাজার কোটি টাকার বাজারে নকল পণ্যের ঝুঁকি
সব মিলিয়ে দেশের লুব্রিকেন্ট বাজার এখন উভয়সংকটে দিন পার করছে। বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব মতে, দেশে বছরে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টন লুব্রিকেন্টের চাহিদা রয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি জোগান দেয় স্থানীয় ব্লেন্ডিং কারখানাগুলো। এই কারখানাগুলো পুরোপুরি আমদানিকৃত গ্রুপ ওয়ান, গ্রুপ টু এবং গ্রুপ থ্রি বেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসল ব্র্যান্ডের লুব্রিকেন্টের দাম যদি এভাবে ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে দামের প্রতি সংবেদনশীল সাধারণ ক্রেতারা খরচ বাঁচাতে নিম্নমানের অথবা রিসাইকেল করা নকল পণ্যের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন। এতে সাময়িকভাবে কিছু টাকা বাঁচলেও দীর্ঘমেয়াদে তা গাড়ির ইঞ্জিনের বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে। একদিকে অভ্যন্তরীণ পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন মিলে লুব্রিকেন্ট বাজারকে যে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের পথ আপাতত বেশ কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

