দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে প্রায় ২১১ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বৈদেশিক মুদ্রা কেনা, আমদানি বিল পরিশোধ, ঋণ বিতরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একজন সহকারী পরিচালককে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক অভিযোগে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টিও রয়েছে। তবে অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে মার্কিন ডলার কেনার অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে ডলারের স্বাভাবিক বাজারদর ছিল ১০৯ টাকা থেকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে। অথচ পূবালী ব্যাংকের একটি শাখায় প্রতি ডলার ১১৩ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা দরে কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনার কারণে প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছিল, লেনদেনের সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছিলেন এবং অতিরিক্ত অর্থের কোনো অংশ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও অনুসন্ধান চলছে।
বৈদেশিক মুদ্রা কেনার পাশাপাশি আমদানি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ম বা হারের বাইরে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এই অর্থের একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের হিসাবে স্থানান্তরের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে অর্থ পাচারের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করছেন অনুসন্ধানকারীরা।
ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়াও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বিতরণ করা কিছু ঋণের অর্থ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ অনুমোদন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং আমদানি বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় ঘটলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের নাম এর আগেও একটি বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে আলোচনায় এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বীমা খাতের প্রতিষ্ঠান ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত মামলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়ের করা অভিযোগে তাঁর নাম যুক্ত ছিল। ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র জালিয়াতি বা মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছিল।
পূবালী ব্যাংকের বর্তমান অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হলো, আলোচিত লেনদেনগুলো কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারা ভূমিকা রেখেছিলেন এবং অর্থের কোনো অংশ অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না। এসব বিষয়ে অনুসন্ধানের ফলাফল সামনে এলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হবে।
তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শেষ হওয়া এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

