হালাল পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে দেশের রপ্তানি বহুমুখী করার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। সংগঠনটি বলছে, এ জন্য বিদ্যমান শিল্পব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানো, হালাল সনদ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা দরকার। বিসিআইয়ের মতে, বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই এ কাজ অনেকটা সম্ভব।
আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর সকালে রাজধানীর গুলশান ক্লাবের ক্রিস্টাল হলে বিসিআইয়ের ত্রৈমাসিক জার্নালের প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। জার্নালের শিরোনাম ‘আনলকিং এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন থ্রু হালাল প্রোডাক্ট’, অর্থাৎ হালাল পণ্যের মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা উন্মোচন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে উৎপাদনশিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এই খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জার্নালের প্রথম সংখ্যায় হালাল পণ্যকে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, নতুন করে বড় বিনিয়োগ না করেও বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে হালাল পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এর জন্য দরকার যথাযথ হালাল সনদ এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
অনুষ্ঠানে জার্নালের বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এর উপদেষ্টা সম্পাদক শিরাজুল ইসলাম কাদির। পরে বিসিআই সভাপতি আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জার্নালের মোড়ক উন্মোচন করেন। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে জার্নালের কপি বিতরণ করা হয়।
বিসিআইয়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, বিপিজিএমইএর সভাপতি সামিম আহমদ, বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার, বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক এবং বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম. শাহাদাত হোসেন।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন কোকা-কোলা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ, বাংলা কেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম. এস. সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল। বক্তারা বিসিআইয়ের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। হালাল পণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের চেষ্টায় পাশে থাকার আশ্বাসও দেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। শেষে বিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এই আহ্বানের পেছনে একটি বাস্তবতা আছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। একটি খাতের ওপর এত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ বৈশ্বিক চাহিদা বা বাণিজ্যনীতি বদলালে পুরো অর্থনীতি চাপে পড়ে। সে কারণে বহুমুখীকরণ নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে আছে। হালাল পণ্যের বিশ্ববাজার বড় ও ক্রমবর্ধমান। মুসলিম-প্রধান দেশে খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যে হালাল সনদের চাহিদা বাড়ছে। এই বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র হতে পারে।
তবে কয়েকটি বিষয় এখানে স্পষ্ট নয়। বিসিআইয়ের দাবি, বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু কোন কোন খাত এতে সুবিধা পাবে, কত রপ্তানি আয় বাড়তে পারে এবং কত সময়ে তা সম্ভব, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রতিবেদনে নেই। হালাল সনদ নিশ্চিত করা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও হতে পারে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারকেরা সাধারণত নিজেদের স্বীকৃত সনদ প্রতিষ্ঠানের সনদ চান। দেশের সনদব্যবস্থা সে মানে পৌঁছাতে না পারলে রপ্তানির সুযোগ সীমিত থাকবে। এ প্রসঙ্গে একটি সমন্বিত হালাল কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় আসে, যদিও এই অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
সব মিলিয়ে হালাল পণ্যকে ঘিরে এই উদ্যোগ রপ্তানি বহুমুখীকরণের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন নজর থাকবে, সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে হালাল সনদব্যবস্থা কত দ্রুত গড়ে তুলতে পারে এবং কার্যকর নীতিসহায়তা মেলে কি না, সেদিকে।

