ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এ প্রকাশিত এক বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. নজরুল ইসলাম ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার বিষয়ে সরকারের যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন, তাকে সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এই গবেষক। তবে তিনি মনে করেন, কেবল কাগুজে জাদুকরী লক্ষ্য নির্ধারণ করে এই অর্জন সম্ভব নয়; বরং পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট থেকে সংগৃহীত অর্থকে প্রকৃত শিল্প উৎপাদনে রূপান্তর করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই হবে এই দীর্ঘ যাত্রার মূল চাবিকাঠি।
ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির কঠিন অর্থনৈতিক হিসাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব উদ্ধৃত করে লেখায় জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সাময়িক জিডিপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪.১৪ শতাংশ। আগামী আট বছরের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপিতে পৌঁছাতে হলে অর্থনীতিকে মূলত বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করতে হবে, যার জন্য প্রতি বছর গড়ে অন্তত ৯ শতাংশ করে নমিনাল প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম হিসাব অনুধাবন করা জরুরি—মূল্যস্ফীতি বাড়লে টাকায় জিডিপি বাড়ে, আবার ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে ডলারের অঙ্কে জিডিপি কমে যায়। তাই কেবল সংখ্যার হিসাব না দেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রকৃত উৎপাদনশীলতার ওপর ভিত্তি করেই এই প্রবৃদ্ধির হিসাব মূল্যায়ন করা উচিত।
ভিয়েতনামের ‘দোই মোই’ রূপান্তর থেকে শিক্ষা
১৯৮৬ সালে ভিয়েতনামের প্রবর্তিত ‘দোই মোই’ নীতি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে ভিয়েতনাম কৃষিভিত্তিক রপ্তানি থেকে বের হয়ে এসে তৈরি পোশাক, পাদুকা ও ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চ মূল্যের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। লেখক উল্লেখ করেন, ভিয়েতনাম কয়েক দশক ধরে যে দক্ষতা ও ধারাবাহিক নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে, তা রাতারাতি আট বছরে হুবহু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে ভিয়েতনামের এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, ধারাবাহিক নীতি, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং শিল্পের সক্ষমতায় টানা বিনিয়োগই যে কোনো সংস্কারকে টেকসই অর্থনৈতিক সুফলে রূপান্তর করতে পারে।
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত চাপ
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান বলে প্রবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প প্রবৃদ্ধি কমে ২.৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭.৯৩ শতাংশে সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই আসে একক তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা ব্যাকগ্রাউন্ডে বিশাল ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। একই সাথে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বা এনপিএল বেড়ে মার্চ ২০২৬-এ ৩২.৬ শতাংশে পৌঁছানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে থাকা সরকারের অবকাঠামোগত অর্থায়নের সামর্থ্যকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলছে। এর সাথে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামা শিল্প প্রবৃদ্ধির গতিকে আরও ধীর করে দিচ্ছে।
২০৩৪ অর্জনের ৫ ধাপের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা
প্রবন্ধে মেজর জেনারেল (অব.) নজরুল ইসলাম ২০৩৪ সালের লক্ষ্য পূরণে একটি সুনির্দিষ্ট ৫ ধাপের অগ্রাধিকারমূলক অ্যাকশন প্ল্যান বা কৌশলগত পথরেখা প্রস্তাব করেছেন:
প্রথমত, ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকট, কাস্টমস জটিলতা বা অনুমোদনের অভাবে আটকে থাকা প্রায় সমাপ্ত কারখানাগুলোর প্রশাসনিক বাধা দূর করে দ্রুত উৎপাদন চালু করতে হবে। কাস্টমস ও বিনিয়োগ বোর্ডকে ত্রৈমাসিকভিত্তিতে এই অগ্রগতির তদারকি করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শুরুর দিন থেকেই ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে হবে। খেলাপি ঋণের বাস্তব সত্য স্বীকার করে ব্যাংকিং সুপারভিশন জোরদার করা, আয়কর প্রদান ব্যবস্থা সহজ করা এবং বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকৃত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমন্বিত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
চতুর্থত, ২০২৯ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে কেবল পোশাকে আটকে না থেকে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল, ফুটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক্স খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল পেতে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইন জোরদার করা দরকার।
পঞ্চমত, ২০৩২ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে যেসব কর্মসূচি বাস্তব সাফল্য দেখাবে, সেগুলোকে আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত করতে হবে এবং যেগুলো ব্যর্থ হবে সেগুলো বন্ধ বা সংস্কার করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি প্রধান উপদেষ্টার বা সরকারের শীর্ষ কার্যালয়ের অধীনে একটি ছোট টিমের মাধ্যমে বার্ষিক ‘স্কোরকার্ড’ তৈরি করে মনিটরিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফাঁকা প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব শিল্পায়নের গুরুত্ব
সাবেক বেপজা প্রধান হিসেবে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে লেখক জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইপিজেডগুলো থেকে ৮.৪১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি এসেছে এবং জুন ২০২৬ পর্যন্ত সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে কেবল বিনিয়োগের চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি সই করলেই অর্থনৈতিক সুফল মেলে না, যতক্ষণ না সেই বিনিয়োগ দিয়ে সচল কারখানা তৈরি হচ্ছে এবং সেখানে দেশীয় লজিস্টিকস, প্যাকেজিং ও কাঁচামাল সরবরাহকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারছে। সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির সমন্বয় ঘটানো গেলেই কেবল ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই অর্থনৈতিক অভিযান দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখবে।

