বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিদেশি ঋণের পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সে পথ যে সহজ নয়, তা-ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
চলমান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বার্ষিক সভায় প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব তথ্য এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেই বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির গতি কমার পাশাপাশি দামের চাপও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
আইএমএফ বলছে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আয় বৃদ্ধির গতিও ব্যাহত হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর।
বিশ্বব্যাংকও সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে উঠে এসেছে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি।
বাইরের উৎস থেকে অর্থের জোগান পাওয়াও এখন সহজ নয়। আইএমএফ এখনো নতুন ঋণ অনুমোদন করেনি। আগের ঋণের চতুর্থ কিস্তি ছাড় নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানিয়েছেন, এ নিয়ে আলোচনা আরও কয়েক মাস চলবে।
অভ্যন্তরীণ উৎসেও চাপ বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকার ব্যাংক খাত থেকে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাত চাপে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, চালু প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাজস্ব আদায়ও কমছে। ফলে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এসেছে। অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উপায়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। গড় হিসাবে এর পরিমাণ বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে আরও অন্তত ১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থও ওই সময়ে প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাবে এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
বর্তমান সরকার পাচারের অর্থ ফেরত আনতে একটি পরিকল্পিত রোডম্যাপ তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। অর্থ ফেরত আনার কার্যক্রম ‘ফাস্ট ট্র্যাকে’ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এ কাজে সহায়তার জন্য নয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) সই করা হচ্ছে। সংস্থাগুলো ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে কাজ করবে। অর্থাৎ সরকারকে আগাম কোনো ফি দিতে হবে না। যে পরিমাণ অর্থ ফেরত আনতে সহায়তা করবে, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে পাবে সংস্থাগুলো। অর্থ ফেরত না এলে তারা সরকারের কাছে কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবে না।
সমন্বয়ের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স। এতে রয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। অবৈধ আর্থিক প্রবাহের উৎস খুঁজে বের করে প্রমাণসহ টাস্কফোর্সের কাছে উপস্থাপনের মূল দায়িত্ব বিএফআইইউর।
সরকার পাচারের অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনি সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় নীতিগতভাবে সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে কাজটি যে কঠিন, তা তদন্তকারীরাও বুঝতে পারছেন। অর্থপাচারকারীরা অবৈধ সম্পদের চূড়ান্ত গন্তব্য গোপন রাখতে জটিল ও বহুস্তরের কৌশল ব্যবহার করছে। কর কর্তৃপক্ষ ও তদন্তকারী সংস্থা প্রাথমিক বহির্গমন পথ আংশিক শনাক্ত করতে পারলেও অর্থ তৃতীয় বা চতুর্থ কোনো দেশে পৌঁছানোর পর তদন্তের সূত্র হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে সম্পদ ঠিক কোথায় জমা আছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, পাচারের অর্থ উদ্ধার করা গেলে সরকারকে বারবার বিদেশি ঋণের জন্য ছুটতে হবে না। বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ছিল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা। তাঁদের মতে, পাচারকৃত অর্থের অর্ধেকও ফিরিয়ে আনা গেলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে এতে ভবিষ্যতে অর্থ পাচারে নিরুৎসাহিত করার বার্তাও যাবে।
তবে বাস্তবতা হলো, অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ থেকে দৃশ্যমান ফল মেলেনি। পাচারের অর্থ উদ্ধার সাধারণত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও আইনি জটিলতায় ভরা প্রক্রিয়া। বিভিন্ন দেশের আইন, আদালতের রায় এবং প্রমাণের মান, সবকিছুর ওপর এর সাফল্য নির্ভর করে। তাই অর্থ ফেরত আনার ঘোষণা ও বাস্তবে অর্থ দেশে আসার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত কত টাকা চিহ্নিত হয়েছে বা কত দিনের মধ্যে কী পরিমাণ অর্থ ফেরত আসবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে। একদিকে প্রবৃদ্ধি কমছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, বিদেশি সহায়তা অনিশ্চিত। অন্যদিকে পাচারের অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই অর্থ উদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটানো, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙা করার মতো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

