উন্নয়নশীল এই দেশে সংস্কার ও সুশাসন ছাড়া নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত কর্মসংস্থানের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।
শাসন ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ দীর্ঘ মেয়াদে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত কর্মসংস্থানের ফাঁদে আটকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রকাশের পর তাঁরা এই উদ্বেগ জানান।
২০৩১ পর্যন্ত সবচেয়ে ধীর
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মন্থরগতির অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নামবে। পরের অর্থবছরে তা ২.২ শতাংশে নেমে যাবে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
এই প্রক্ষেপণ সরকারের আগস্টে প্রকাশিত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই কাঠামোয় ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, অর্থাৎ আইএমএফের হিসাবের সঙ্গে ব্যবধান ৫.৫ শতাংশ পয়েন্ট।
দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি অর্থনীতির মধ্যে ২০২৬-২৭ ও ২০৩০-৩১, দুই মেয়াদেই বাংলাদেশ তলানিতে। ২০৩০-৩১ নাগাদ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ২.৯৭ শতাংশ। সে সময় শ্রীলঙ্কার ৩.৫১ ও পাকিস্তানের ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে ২০২৭ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত প্রতি বছর ৬.৮ শতাংশের বেশি।
মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১০.৯ শতাংশ
আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াতে পারে ১০.৯ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ছয় মাস আগের ৬ শতাংশ প্রাক্কলনের প্রায় দ্বিগুণ। আইএমএফ মূলত একটি ‘বেজলাইন’ বা মৌলিক প্রক্ষেপণ তুলে ধরেছে। বিবিএসের সর্বশেষ যে হিসাব আমরা পেয়েছি, সে অনুযায়ী জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। টানা চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
তিন সংস্থার পূর্বাভাস ক্রমে নিচে
এক সপ্তাহ আগে বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল। সেপ্টেম্বরে এডিবি আভাস দিয়েছিল ৪ শতাংশের। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে তিন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস একের পর এক নিচে নেমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে আরও গভীর করেছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেখা যাচ্ছে, জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ২.৯৩ শতাংশে নেমেছে। এডিবির ভাষ্যমতে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যালান্সশিট ও ঝুঁকিহীন সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের ঝোঁকের কারণে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না। অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস জটিলতা ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়াও নতুন বিনিয়োগ আটকে দিচ্ছে। ফলে মুদ্রানীতি সহজ করলেও তার প্রভাব অর্থনীতিতে সেভাবে পড়ছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতবাদ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন,“বিশ্বব্যাংকের ছয়টি সুশাসনের সূচক দিয়ে যদি আপনি আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সাথে বাংলাদেশের তুলনা করেন, তাহলে দেখবেন সবকটি সূচকেই আমাদের অবস্থান তলানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও কেন অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স এত বেশি খারাপ এই ডেটাই তার প্রমাণ দেয়। তাই সংকটকে শুধুই বৈশ্বিকঘটনার পরিণতি বলে চালিয়ে দেওয়া এক ধরণের ‘অর্ধ-সত্য’ ছাড়া কিছুই নয়।”
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে চলা মন্থরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিই আইএমএফের পূর্বাভাসে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মতে, ৬-৯ শতাংশ সুদহারের মতো ভুল সিদ্ধান্ত ও সংস্কারে দীর্ঘ অনীহা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে, আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তা আরও গভীর করেছে। তিনি কঠোর মুদ্রানীতি ধরে রাখা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজস্ব ও বিনিয়োগ না বাড়লে এখন প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই মনোযোগ দেওয়া উচিত, কারণ এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সুরক্ষা পাবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন কর্মসংস্থানের জটিল ফাঁদে পড়েছে। এতে দারিদ্র্য নিরসনের অতীত সাফল্য উল্টো পথে যাচ্ছে বলে তাঁর আশঙ্কা। এই ফাঁদ ভাঙতে তিনি আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি, বিকেন্দ্রীকরণ, সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, সমন্বিত নীতি এবং অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধের কথা বলেছেন।

