উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খাবার বাজারে পাওয়া গেলেও অনেক পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় খাদ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ চার মাসে দেশে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ২৮ লাখ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বন্যায় কৃষিজমির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরার এই দিনে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যসংকটের ঝুঁকি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
খাদ্যপণ্যের দাম চাপে ফেলছে নিম্ন আয়ের মানুষকে
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবে, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি অন্তত ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এ দামে নিয়মিত খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে মাসিক আয়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে খাদ্য সংগ্রহে।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা জোরালো হয় ২০২২ সালের শুরুর দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরবর্তী কয়েক মাসও এ হার ১০ শতাংশের ওপরে ছিল।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা কমলেও বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সেপ্টেম্বরের হিসাবে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। অর্থাৎ দাম বাড়ার গতি কমলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ১৩ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়লে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এ দুই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত খাবার কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও কৃষকের আয়
খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ।
কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু খাদ্য উৎপাদনই ব্যাহত হয় না, কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয়ও কমে যেতে পারে। ফলে একদিকে বাজারে খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিজেদের খাবার কেনার সামর্থ্যও হ্রাস পায়। এই দ্বিমুখী প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রবাসী আয়ে অনিশ্চয়তা নিয়েও উদ্বেগ
বাংলাদেশের বহু পরিবারের জীবনযাত্রা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে অর্থ পাঠানোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত প্রবাসী আয়ের অর্থ দিয়ে খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটায়, তাদের জন্য আয় কমে যাওয়া নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার প্রভাব শুধু খাবারের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুষ্টির প্রশ্নও। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়। অর্থাৎ বয়সের তুলনায় তাদের উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই খাদ্যসংকট মোকাবিলায় শুধু পেট ভরানোর মতো খাবার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবারের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি খাদ্য বিতরণ ও মজুতের চিত্র
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।
খাদ্যশস্যের মজুত থাকলেও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে তা যথাসময়ে ও সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকলে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় খাবার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এ কারণে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তার পরামর্শ
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শনাক্ত করে তাদের কাছে কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
তার মতে, নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং প্রকৃত অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি ও পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি ঠেকাতেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।
সব মিলিয়ে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ কেবল খাদ্য উৎপাদন বা মজুতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের আয়, বাজারদর, কর্মসংস্থান, কৃষির ক্ষতি এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। তাই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সময়মতো সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং কৃষি উৎপাদন সুরক্ষার উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকর করা জরুরি। তা না হলে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে থাকতে পারে।

