আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার পেতে চায় বাংলাদেশ। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে এই অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংককে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ঋণচুক্তি সই হতে পারে। তবে ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ ও শর্ত ঠিক হবে আরও পরে।
ব্যাংককে চলমান ২০২৬ সালের আইএমএফ–বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে এই বৈঠক হয়। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আইএমএফের পক্ষে ছিলেন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক। প্রতিনিধিদলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকটিকে ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পাওয়া নিয়েও তাঁরা আশাবাদী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের স্টাফ মিশন বাংলাদেশ সফরে আসবে। সেই সফরের সময় স্টাফ পর্যায়ের আলোচনায় ঋণের পরিমাণ ও শর্ত চূড়ান্ত করা হবে। এরপর বিষয়টি যাবে আইএমএফের বোর্ড সভায়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ বা কিস্তির সংখ্যা সরাসরি নিশ্চিত করেননি। তাঁর বক্তব্য, এসব বিষয় ঠিক হবে স্টাফ পর্যায়ের আলোচনা ও বোর্ড সভায়। তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ২০২৯ সালের মধ্যেই সংস্কার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, এরপর সরকারকে জনগণের ম্যান্ডেটের মুখোমুখি হতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য কিছু শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণ করতে হবে। তবে কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। শর্তগুলো কী হবে এবং কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা চলবে।
আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-পরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র জানান, প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ সাড়ে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনায় রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সংস্থাটি। এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব–জিডিপি অনুপাত কমে ৭ শতাংশে নেমেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে পড়ে।
জৈন-চন্দ্রের মতে, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। এর পাশাপাশি আইএমএফ তিনটি বিষয়ে জোর দিয়েছে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা সমাধানে কৌশলগত পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা। তৃতীয়ত, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাত, কর–জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনর্মূলধন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ নানা বিষয়ে আইএমএফ উদ্বেগ জানিয়েছে। এসব বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশও একমত। তাঁর ভাষ্য, ইতিমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে। তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজেট–পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা জানান, আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো ও খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা ছিল। সংকটে থাকা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ইতিমধ্যে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়াও শুরু হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকের আমানতকারীদের নিয়মিত অর্থ ফেরত দিয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে চাইছে সরকার। খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনাও প্রস্তুত করছে প্রতিনিধিদলটি।
খেলাপি ঋণের চিত্র অবশ্য উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সই হওয়া ঋণচুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এখন তা বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নতুন কর্মসূচিতে এই হার কতটা কমানো হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
ব্যাংককে আইএমএফ–বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা শুরু হয়েছে গত ১২ অক্টোবর। তা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে ঋণ পাওয়ার পথে প্রাথমিক আলোচনা এগোলেও আসল পরীক্ষা শর্ত পূরণে। রাজস্ব–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশে নেমে আসা এবং খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের লক্ষ্যের তিন গুণের বেশি হয়ে যাওয়া দেখায়, সংস্কারের চ্যালেঞ্জ বড়। আইএমএফ যেহেতু রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সংস্কার ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর জোর দিচ্ছে, তাই কর আদায় বাড়ানো ও দুর্বল ব্যাংক সামলানো সরকারের জন্য কঠিন হবে। একই সঙ্গে সংস্কারের সময়সীমা ২০২৯ সালের মধ্যে বেঁধে দেওয়ায় নির্বাচনের আগেই অনেক অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এখন নজর থাকবে চলতি মাসের শেষে আসা আইএমএফ স্টাফ মিশনের আলোচনায় ঋণের পরিমাণ ও শর্ত কী দাঁড়ায়, তার দিকে।

