চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা পণ্যের ভুল ঘোষণা ও গোপন করার মাধ্যমে ছয়টি বড় চালানে সাত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল। কম শুল্কের পণ্যের নামে উচ্চ শুল্কযোগ্য প্রসাধনী, গাড়ির ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার, নাট, বোল্ট ও বিয়ারিং আমদানির অভিযোগ উঠেছে। শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যৌথ দল বন্দরে আমদানি করা বিভিন্ন চালান পরীক্ষা করে এসব অনিয়মের সন্ধান পায়। তদন্তে দেখা যায়, কিছু আমদানিকারক পণ্যের প্রকৃত বিবরণ গোপন করে তুলনামূলক কম শুল্ক প্রযোজ্য এমন পণ্যের নাম ঘোষণা করেছেন। ফলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
প্রথম ঘটনায় ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার ফর্চুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে আমদানি করা ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার যন্ত্রের ঘোষণা দেয়। তবে চালানটি সরেজমিনে পরীক্ষা করে ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে মঞ্চের আলোকসজ্জার বাতি, মুখ ও রোদ থেকে সুরক্ষার ক্রিম, টুথপেস্ট, ত্বকের মৃত কোষ দূর করার জেল, ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত সিরাম, এলইডি বাতি, রোদচশমা এবং কালো চুলের শ্যাম্পু পাওয়া যায়।
এ চালানের প্রকৃত ও ঘোষিত পণ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে। পণ্যগুলোর ওজন ঘোষণার তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি বেশি ছিল। এ ঘটনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
দ্বিতীয় ঘটনায় পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার কাফ করপোরেশন চীন থেকে ২২ দশমিক ৫ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা করে ঘোষিত পণ্যের মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি পাওয়া যায়। বাকি অংশের সঙ্গে পাকিস্তানি গোড়ি বিউটি ক্রিম, মুখ ও রোদ থেকে সুরক্ষার ক্রিম, বয়সের ছাপ কমানোর জেল, লোম অপসারণের স্প্রে, রোদচশমা এবং বিলম্ব ঘটানোর স্প্রেসহ বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলো ঘোষণায় উল্লেখ ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই চালানে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করা হয়েছে। ছয়টি ঘটনার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ।
এইচআর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিনের রাবার বুশের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে পরিদর্শনের সময় ঘোষিত পণ্যের মাত্র ৬ হাজার ৬২৫ কেজি পাওয়া যায়। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল ইঞ্জিন মাউন্ট, গাড়ির সাসপেনশন ও বিভিন্ন বাহুর বুশ, কেন্দ্রীয় বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল এবং স্টিয়ারিংয়ের যন্ত্রাংশ।এ ঘটনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৪৪ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স চীন থেকে ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি তাপ-স্থানান্তর কাগজ আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু চালান পরীক্ষা করে পাওয়া যায় মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি ঘোষিত পণ্য। বাকি ২১ হাজার ৪৬৭ কেজি পণ্যের মধ্যে ছিল ঘোষণায় উল্লেখ না করা পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার।এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্য দুটি চালানেও অনিয়মের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দা ও শুল্ক কর্মকর্তারা। মোহাম্মদিয়া ট্রেডের একটি চালানে ২২ টনের বেশি অঘোষিত নাট, বোল্ট ও স্ক্রু পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৩২ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের চালানে নাট, বোল্ট, ভারী রোলিং বিয়ারিং এবং ঘূর্ণায়মান চেয়ারে ব্যবহৃত গ্যাস-লিফট সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৪২ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
ছয়টি ঘটনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির হিসাব যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সামগ্রিকভাবে সাত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত ও চূড়ান্ত শুল্ক নির্ধারণের পর প্রকৃত অঙ্ক নিশ্চিত হতে পারে।
পণ্য ঘোষণায় অনিয়মের পাশাপাশি কাফ করপোরেশনের একটি কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও শনাক্ত করেছেন কর্মকর্তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, কনটেইনারটি পরিদর্শনের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় আসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল। এ অবস্থায় কনটেইনারটির মূল সিল ভেঙে অন্য সিল লাগিয়ে সেটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পরে কনটেইনারটি জব্দ করে নিরাপত্তার আওতায় রাখা হয়েছে। ঘটনাটি আমদানি করা পণ্যের ঘোষণা যাচাই এবং বন্দরে কনটেইনারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নজরদারির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনাকারী এজেন্টদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের শুল্ক আইনের ৩৩ ও ১৭১ ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শুল্ক ফাঁকি রোধে আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত বিবরণ, পরিমাণ ও মূল্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের পার্থক্য থাকলে সরকার একদিকে যেমন রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্যও অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে শনাক্ত হওয়া এসব ঘটনা আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পণ্য খালাসের আগে কার্যকর তদারকি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

