আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যুক্তিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নির্ধারিত দামে বিভিন্ন খরচ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে একাধিক কোম্পানি। প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে ভোক্তাদের এলপিজি কেনার খরচ আরও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগ্রহীরা ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত লিখিত মতামত জমা দিতে পারবেন।
কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয়, মুনাফা এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে ব্যয় নির্ধারণে কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
ওমেরা এলপিজি প্রতি কেজি গ্যাসের সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১২ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রেশ এলপিজি ২৫ টাকা, ডেল্টা এলপিজি ৩০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজি ১৯ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সেপ্টেম্বরে এ দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে ভোক্তাদের। বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে অন্তত ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
ওমেরা এলপিজি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১৩৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমান সরকারি দামের চেয়ে ৩০০ টাকা বেশি। কোম্পানিটি প্রতি কেজি গ্যাসের সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ২৫ পয়সা করতে চায়। পাশাপাশি, প্রতি সিলিন্ডারে মুনাফা ও কোম্পানি কর বাবদ প্রায় ১৪০ টাকা এবং অর্থায়ন ব্যয় বাবদ ৮৭ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ওমেরার প্রস্তাবে খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। তবে পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকায় অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিটি।
মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন ফ্রেশ এলপিজি প্রতি কেজি গ্যাসের সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশকদের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। ফ্রেশ এলপিজি বছরে ১৫ শতাংশ ঋণ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে বিনিয়োগের বিপরীতে ২০ শতাংশ মুনাফার প্রস্তাবও দিয়েছে।
ডেল্টা এলপিজি প্রতি কেজি গ্যাসের সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১৫ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। কোম্পানিটি পরিবেশকদের কমিশন প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ১০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি প্রতি কেজিতে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১৯ টাকা ৫০ পয়সা, অর্থায়ন ব্যয় ৮ টাকা ১২ পয়সা এবং টার্নওভার কর ১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন এবং অটোগ্যাস সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২০৫ টাকা ৪২ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। অক্টোবরে বিইআরসি নির্ধারিত এ ধরনের সিলিন্ডারের দাম ছিল ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা।
কোম্পানিগুলো আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কথা বললেও বিইআরসি সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে জাহাজভাড়া ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম বাবদ অনুমোদিত ব্যয় প্রতি টনে ১৬০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৫০ ডলার করেছে। একই সময়ে সৌদি আরামকোর গড় চুক্তিমূল্য প্রতি টনে ৬৪৭ ডলার ৭৫ সেন্ট থেকে বেড়ে ৭১২ ডলার ৫০ সেন্ট হয়েছে। ওমেরার প্রস্তাবে অক্টোবরের এ দুটি মূল্যই বহাল রাখা হয়েছে।
এদিকে, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। চারটি প্রতিষ্ঠান ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি পরিবেশক কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিকে এ দাবির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেছেন, কোম্পানিগুলো তাদের ব্যয়ের হিসাব সরকারের মূল্যায়নের জন্য জমা দিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্যয় বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারের অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সরকারি দামে ভোক্তারা কেন এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কেন তারা পাচ্ছেন না, তা আমি বলতে পারব না। আমরা তা নিয়ে আসব।”
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়টি তদারক করা তাঁর দায়িত্ব নয় বলেও জানান আমিরুল হক। তাঁর মতে, এ বিষয়ে নজরদারির দায়িত্ব সরকারি কর্তৃপক্ষের।

