মাসের বেতন কখন ফুরিয়ে যায়, তা টেরই পান না অনেক পরিবার। বাজার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা আর যাতায়াতের খরচ মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমানো তো দূরের কথা, আগের সঞ্চয়ও ভাঙতে হচ্ছে। এমন এক পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে উঠে এসেছেন রাশেদুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তাঁর মাসিক খরচ ৭০ হাজার টাকার বেশি, অথচ আয় সেই হারে বাড়েনি। বাড়তি কাজ করেও মাস শেষে হাত খালি থাকে। হঠাৎ অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে কী হবে, সেই দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়া করে ফেরে।
এ চিত্র এখন অনেক পরিবারেই চেনা। নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। মাসের শুরুতে করা বাজেট মাঝপথেই ভেঙে পড়ে। অথচ জরুরি সময়ে হাতে টাকা না থাকলে ধার বা ঋণই ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক, আয়ের বড় অংশ সংসার চালাতেই শেষ হলে সঞ্চয় হবে কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর শুধু খরচ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দরকার আয়-ব্যয়ের নিয়মিত হিসাব, ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা, ছোট লক্ষ্য নিয়ে সঞ্চয় শুরু করা এবং জরুরি প্রয়োজনের জন্য আলাদা তহবিল গড়ে তোলা।
সঞ্চয়ের প্রথম ধাপ হলো নিজের টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা জানা। এক মাসের সব খরচ লিখে রাখলে স্পষ্ট হয়, কোনগুলো অপরিহার্য আর কোনগুলো বদলানো সম্ভব। বাসাভাড়া, বাজার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাস, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় এক ভাগে, আর বাইরে খাওয়া, অনলাইন কেনাকাটা ও বিনোদন আরেক ভাগে রাখা যায়। দিনে মাত্র ৫০ টাকার অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে পারলে মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ এবং বছরে ১৮ হাজার টাকা বাঁচে। খাতা, মুঠোফোনের নোট বা স্প্রেডশিট, যেকোনো মাধ্যমেই এ হিসাব রাখা সম্ভব।
দ্বিতীয় কৌশল হলো আয় হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের অংশ আলাদা করে ফেলা। অনেকেই খরচ মিটিয়ে যা বাকি থাকে, তা জমাতে চান। কিন্তু খরচ বাড়লে বাকি কিছুই থাকে না। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী আগেই নির্দিষ্ট অঙ্ক সরিয়ে রাখা কার্যকর। মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন এমন কেউ ৫০০ টাকা রাখলে বছরে ছয় হাজার, এক হাজার টাকা রাখলে ১২ হাজার টাকা জমে। অঙ্ক ছোট মনে হলেও নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ার জন্য এটি ভালো সূচনা। আয় কম হলে বা জরুরি খরচ বেশি থাকলে অঙ্ক আরও কম হতে পারে। শুরুতে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ঋণ না বাড়িয়ে নিয়মিত কিছু টাকা জমানো।
সংসারের বড় ব্যয়ের একটি খাত খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এখানে পরিকল্পনা করে কেনাকাটা করলে কিছু অর্থ বাঁচানো যায়। বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা তৈরি, সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা, বিভিন্ন দোকানে দামের তুলনা, মৌসুমি ফল-সবজি ও সাশ্রয়ী দেশীয় বিকল্প বেছে নেওয়া এবং ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেখে অতিরিক্ত পণ্য না কেনা এ ক্ষেত্রে সহায়ক। প্রতিদিন বাইরে নাশতা কেনার অভ্যাস থাকলে কিছুদিন বাসা থেকে খাবার নেওয়ার চেষ্টাও করা যায়। তবে ব্যয় কমাতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। লক্ষ্য হবে অপচয় কমানো, প্রয়োজনীয় চাহিদা বাদ দেওয়া নয়।
চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা আয় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ই প্রথম ভরসা। তাই শুরুতে বড় অঙ্ক না হলেও একটি জরুরি তহবিল গড়া দরকার। প্রথম লক্ষ্য হতে পারে পাঁচ হাজার টাকা, এরপর ১০ হাজার, তারপর ধীরে ধীরে আরও। দীর্ঘ মেয়াদে পরিবারের তিন থেকে ছয় মাসের অপরিহার্য খরচের সমান অর্থ জমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এটি তাৎক্ষণিক বাধ্যবাধকতা নয়, সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগোনোই বাস্তবসম্মত। এই অর্থ এমন নিরাপদ জায়গায় রাখা ভালো, যেখান থেকে প্রয়োজনে দ্রুত তোলা যায়, আর দৈনন্দিন কেনাকাটা বা বিনোদনে তা খরচ না করাই শ্রেয়।
ঋণের বিষয়েও সতর্কতা জরুরি। উচ্চ সুদের ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বা কিস্তিতে কেনাকাটার দায় ভবিষ্যতের আয় কমিয়ে দেয়। তাই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় ঋণ নেওয়ার আগে কিস্তি শোধের সামর্থ্য ভেবে দেখা দরকার। আগের ঋণ থাকলে সুদের হার, কিস্তি ও মেয়াদ লিখে রাখা এবং বাড়তি অর্থ থাকলে উচ্চ সুদের ঋণ আগে শোধ করা ভালো। তবে সব সঞ্চয় ঋণ শোধে ঢেলে হাতে একেবারে টাকা না রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। জরুরি তহবিল ও ঋণ পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় ৫০/৩০/২০ নামে একটি পরিচিত নিয়ম আছে। এতে কর-পরবর্তী আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত পছন্দে এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও ঋণ শোধে রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক পরিবারের জন্য এ অনুপাত বাস্তবসম্মত নয়। যাঁর আয়ের প্রায় পুরোটাই বাসাভাড়া, খাবার ও চিকিৎসায় যায়, তাঁর পক্ষে ২০ শতাংশ জমানো কঠিন। তাই একে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য না ধরে দিকনির্দেশনা হিসেবে নেওয়াই ভালো। কেউ মাসে পাঁচ শতাংশ জমাতে পারলে সেখান থেকেই শুরু করা যায়। আয় বাড়লে বা খরচের চাপ কমলে হার বাড়ানো সম্ভব।
সঞ্চয়ের টাকা কোথায় রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি তহবিলের জন্য সহজে তোলা যায় এমন হিসাব উপযোগী। দীর্ঘ মেয়াদি সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক আমানত বা উপযুক্ত সঞ্চয়পণ্য বিবেচনা করা যায়। কোনো পণ্য বেছে নেওয়ার আগে মুনাফার হার, কর ও ফি, মেয়াদ, মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তোলার শর্ত এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা দরকার। শুধু বেশি মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। যে অর্থ জরুরি প্রয়োজনে লাগতে পারে, তা সহজে ভাঙানো যায় না এমন পণ্যে আটকে রাখা উচিত নয়।
তবে সঞ্চয়ের আলোচনায় একটি বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সবার পক্ষে সঞ্চয় সমান সহজ নয়। কারও আয় সীমিত, কারও পরিবারের সদস্য বেশি, কেউ আবার চিকিৎসা বা ঋণের চাপে আছেন। তাই সঞ্চয় করতে না পারার সব দায় ব্যক্তির খরচের অভ্যাসের ঘাড়ে চাপানো যুক্তিসংগত নয়। আয় বৃদ্ধি, স্থিতিশীল কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরিও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, আয় পেয়েই সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা আলাদা করা এবং জরুরি তহবিল গড়ার মতো অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার পুরো সমাধান এতে মেলে না।
সঞ্চয়ের লক্ষ্য শুরুতেই বড় অঙ্কের সম্পদ গড়া নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি আর্থিক ভিত্তি তৈরি করা, যা হঠাৎ বিপদে ধার করার প্রয়োজন কমাবে এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সামলাতে সহায়তা করবে। সংসারের খরচ যতই বাড়ুক, সামর্থ্যের মধ্যে নিয়মিত জমানোর অভ্যাসই হতে পারে আর্থিক নিরাপত্তার প্রথম পদক্ষেপ।

