সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আয় বাড়াতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এর অংশ হিসেবে আগামী নভেম্বর থেকে প্যাকেটজাত হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া ও চা বিক্রি শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। আগে থেকেই সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণের মতো পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। নতুন পণ্য যুক্ত করে একদিকে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী দামে কেনাকাটার সুযোগ বাড়ানো, অন্যদিকে সংস্থার বাণিজ্যিক আয় বাড়ানোই লক্ষ্য।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বাসসকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, চা বিক্রির অনুমোদন পাওয়া গেছে। নভেম্বরেই বাজারে আনার প্রস্তুতি চলছে। একই সময়ে প্যাকেটজাত হলুদ ও মরিচের গুঁড়া বিক্রিও শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আটা বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করছে সংস্থাটি। বাজারের চাহিদা যাচাই করতে জরিপও চলছে। জরিপের ফল ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে আরও পণ্য যুক্ত করা হবে।
টিসিবি বর্তমানে কাপড় কাচার সাবান, গোসলের সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি করছে। এসব পণ্য প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হলেও সংগ্রহমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা বাজারের তুলনায় কম দামে পণ্য পাচ্ছেন, আবার টিসিবিও এসব বিক্রি থেকে কিছু মুনাফা করছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে।
পণ্যের তালিকা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রেতার সংখ্যাও বাড়াতে চায় টিসিবি। চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন বাণিজ্যিক পণ্যের মাধ্যমে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। আগামী অর্থবছরে গ্রাহকসংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করতে চায় তারা। চেয়ারম্যানের ধারণা, এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে সম্প্রসারিত পণ্যসম্ভার থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত আয় বা আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত আয় নির্ভর করবে বিক্রির পরিমাণ ও পরিচালন দক্ষতার ওপর। তাঁর ভাষ্য, নতুন পণ্য বিক্রির উদ্যোগ মাত্র চার মাস আগে শুরু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের সাড়া মোটামুটি ভালো।
নতুন পণ্য বিক্রির কারণে সরকার ভর্তুকি দিয়ে যেসব পণ্য সরবরাহ করে, সেগুলোর দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন টিসিবি চেয়ারম্যান। নতুন পণ্যগুলোও প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হবে। তবে সেগুলো কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত ক্রেতাদের ওপরই থাকবে। একসঙ্গে সব পণ্য বাজারে না এনে ধাপে ধাপে তালিকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ক্রেতারা টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্র থেকেই নিয়মিত প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্য কেনার সুযোগ পান।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমাতেও কাজ করছে সংস্থাটি। চিনি ও মসুর ডাল কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের বদলে নগদ অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া যায় এমন বেসরকারি ব্যাংকের সেবা নেওয়া এবং এপিআই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রির অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা করার ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। পরিবহন ও পণ্য ওঠানো-নামানোর খরচ কমাতে আঞ্চলিক গুদাম থেকে সরাসরি পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে। স্মার্ট কার্ডভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির মতো পণ্য বিক্রির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে টিসিবি। এর মধ্যে ভোজ্যতেল বিক্রির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চলছে এবং সম্ভাব্য ডিলারদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হয়েছে।
টিসিবির চেয়ারম্যানের মতে, শুধু খরচ কমিয়ে সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব নয়, পাশাপাশি সংস্থার নিজস্ব আয়ও বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যেই আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে পণ্যসংখ্যা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। সাশ্রয়ী দাম বজায় রেখে কতটা নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এবং নতুন ব্যবসা থেকে বাস্তবে কতটা আয় আসে, তার ওপরই এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর

