চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কায়িক পরীক্ষা ও নজরদারিতে ৪৬৭টি সন্দেহজনক চালান জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখা। এসব অনিয়মে কাস্টমস এ পর্যন্ত ২৭০টি মামলা করেছে। জরিমানা ও বকেয়া রাজস্ব মিলিয়ে আদায় হয়েছে ৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।
কাস্টমসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার জালিয়াতি শনাক্তের হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জব্দ হয়েছিল ৩৬১টি চালান, আর আদায় হয়েছিল ৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে জব্দ চালান বেড়েছে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ, কিন্তু রাজস্ব ও জরিমানা আদায় বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে জব্দ হয়েছিল মাত্র ১৬৭টি চালান, আদায় হয়েছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ বা মূল্য কম দেখানো, ভুল শুল্কশ্রেণি (ট্যারিফ ক্লাসিফিকেশন) উল্লেখ করা এবং এক পণ্যের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের ভিন্ন পণ্য আনার ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি ধরা পড়া বিভিন্ন চালানে এর প্রমাণ মিলেছে। স্ক্র্যাপের আড়ালে দামি গাড়ি ও যন্ত্রপাতি, মডেলিং ক্লে-র আড়ালে প্রসাধনী এবং সাধারণ পণ্যের আড়ালে স্মার্টফোন আনার চেষ্টাও শনাক্ত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে ধরা পড়া দুটি চালান এ প্রবণতার স্পষ্ট উদাহরণ। কাউবয় ফুডস কোম্পানি লিমিটেড চীন থেকে জেনারেটর সেট ও যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় ১৩ হাজার ৩৩৫ কেজি অঘোষিত পণ্য। এর মধ্যে ছিল সোলার স্ট্রিটলাইট, ইনভার্টার, পোর্টেবল পাওয়ার স্টেশন, ফুড অ্যাডিটিভস, টি-সেট ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এতে ৪৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল। কাস্টমস ৫০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা করেছে।
অন্য ঘটনায় রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চীন থেকে ২ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩ কেজি সিমলেস পাইপ আনার ঘোষণা দেয়। পরিদর্শনে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে ৭২ হাজার ৫০০ কেজি বা ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি পাইপ পাওয়া যায়। এতে সম্ভাব্য ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিপরীতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও ১৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা করা হয়েছে। শুধু এই দুই চালান থেকেই জরিমানা ও বিমোচন চার্জ বাদে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানো গেছে।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি চালান জব্দ করে এবং ৮৪৩টি মামলা দায়ের করে। ওই বছর জরিমানা বাবদ ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং বকেয়া রাজস্ব বাবদ ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা, মোট ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই আদায় গত বছরের পুরো আদায়ের অর্ধেকের কিছু বেশি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বলেন, চার দশকের পেশাগত অভিজ্ঞতায় মিথ্যা ঘোষণার বিরুদ্ধে এত ব্যাপক তদারকি ও মামলা আগে দেখেননি। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নজরদারি নজিরবিহীনভাবে জোরদার হওয়ায় অনিয়ম বেশি ধরা পড়ছে।
তবে এই তদারকি যেন বৈধ ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, অনেক সময় সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব অনিয়ম করে, যা মূল প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে। শুধু জরিমানা করে ছেড়ে না দিয়ে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সব চালানে ঢালাও তল্লাশির বদলে ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি বাড়ানোর পরামর্শ দেন, যাতে বৈধ পণ্য দ্রুত খালাস হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন জানান, মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর (এনএসডব্লিউ) আওতায় সব সেবা একীভূত করার কাজ চলছে। ঝুঁকিভিত্তিক চালান চিহ্নিত করে কায়িক পরীক্ষা আরও জোরদার করা হবে। এতে একদিকে রাজস্ব ফাঁকি রোধ হবে, অন্যদিকে বৈধ পণ্যের দ্রুত খালাস নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দ ও মামলার সংখ্যা বাড়ার অর্থ এই নয় যে বন্দরে হঠাৎ অপরাধ এক লাফে বেড়ে গেছে। বরং কঠোর আইন প্রয়োগ ও তদারকির কারণে অতীতে অধরা থাকা জালিয়াতি এখন বেশি ধরা পড়ছে। তবে ঘটনার ধরন বলছে, ঘোষণায় ফাঁকি দেওয়ার কৌশল ক্রমে জটিল হচ্ছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি কতটা কার্যকরভাবে চালু করা যায়, সেটিই আগামীর মূল চ্যালেঞ্জ।

