বাংলাদেশ ও সৌদি আরব যৌথ মালিকানায় সৌদি আরবে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। বছরে ১০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার এ কারখানার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একাধিক উৎস থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোই লক্ষ্য।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাব অনুযায়ী দুই দেশের সরকার ৫০:৫০ অংশীদারিত্বে একটি নতুন কোম্পানি গঠন করবে, যা কারখানাটি পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ ওই কারখানার সব উৎপাদিত সার ২০ থেকে ২৫ বছর কেনার নিশ্চয়তা দেবে। আর সৌদি আরব গ্যাস ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ দুই সরকার সমান হারে দেবে, বাকি ৭০ শতাংশ আসবে সৌদি আরবের আর্থিক খাতের ঋণ থেকে। ২০৩০ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নভেম্বরে প্রস্তাবিত সৌদি আরব সফরের সময় একটি অবাধ্যতামূলক (নন-বাইন্ডিং) সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সফর নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে হতে পারে, তবে তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত এমওইউর একটি ধারণাপত্র তৈরি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ডিএপির চাহিদা, আমদানির প্রয়োজন ও প্রস্তাবিত ক্রয়নিশ্চয়তা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতামতও চাওয়া হয়েছে। এই এমওইউ কোনো দেশকে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধ্য করবে না।
শিল্পসচিব আবদুন নাছের খান বলেন, পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। প্রকল্পের কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি কারিগরি-অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানার উৎপাদন জাতীয় চাহিদার তুলনায় সামান্য। কাঁচামালের সংকটে কখনো কখনো উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকে, ফলে দেশ আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে সৌদি আরব থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবে যৌথ উদ্যোগের কারখানা হলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ডিএপি সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে বর্তমান আমদানির তুলনায় কম দামে সার কেনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মাঠপর্যায়ে ডিএপির বার্ষিক চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে (বিএডিসি) ৫ লাখ টনের বাফার মজুতও রাখতে হয়, ফলে মোট বার্ষিক প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টন। বেসরকারি খাত আমদানি করে প্রায় ৫ লাখ টন, আর বিসিআইসির দেশীয় উৎপাদন সীমিত। বাকি অংশ বিএডিসি সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে বিএডিসিকে বছরে ৯ দশমিক ৪০ থেকে ১০ লাখ টন ডিএপি আমদানি করতে হতে পারে। প্রস্তাবিত সৌদি কারখানার বার্ষিক সক্ষমতা এ পরিমাণের কাছাকাছি, ফলে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চিত উৎস থেকে আমদানির বড় অংশ পাওয়া সম্ভব হতে পারে। প্রস্তাবের বিষয়ে মতামতে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কারখানার পুরো উৎপাদন কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা সরকার দিতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ও দেশের আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার তত্ত্বাবধায়ক বিসিআইসি প্রস্তাবিত সৌদি-ভিত্তিক যৌথ কোম্পানিতে বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে দুই সরকারের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
প্রকল্পের নির্মাণব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি। কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর মোট বিনিয়োগ, অর্থায়ন ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক শর্ত চূড়ান্ত করা হবে। ২০ থেকে ২৫ বছরের ক্রয়নিশ্চয়তা কারখানার উৎপাদিত সারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা নিশ্চিত করে সৌদি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা ও উৎপাদন খরচ সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
এমওইউ সইয়ের পর দুই দেশ প্রকল্পের কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। দুই পক্ষ এগোতে রাজি হলে বিনিয়োগ, অর্থায়ন, কাঁচামাল সরবরাহ ও সার ক্রয় নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবটি সৌদি আরবের তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে নেওয়া ভিশন ২০৩০–এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব থেকে ডিএপি সার আমদানি করছে। সর্বশেষ দুই বছরের চুক্তি সই হয় ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর। এতে বছরে ১৫টি চালানের কথা রয়েছে, যার মধ্যে ১১টি নিশ্চিত ও চারটি ঐচ্ছিক। নিশ্চিত চালানের আওতায় বাংলাদেশকে বছরে অন্তত ৪ লাখ ৪০ হাজার টন আমদানি করতে হবে।
দেশের মোট ডিএপি আমদানিও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ১২ লাখ ৭২ হাজার টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৬ লাখ ২০ হাজার টন। প্রস্তাবিত কারখানা চালু হলে এটি বাংলাদেশের আমদানি প্রয়োজনের একটি বড় অংশ জোগান দিতে পারবে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিকল্পনায় বিদ্যমান জিটুজি প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে এর উৎপাদন কীভাবে মেলানো হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ডিএপি সার ভোক্তাপর্যায়ে কেজিপ্রতি ২১ টাকায় বিক্রি হয়, আমদানি ও খুচরা দামের ব্যবধান সরকার ভর্তুকি দিয়ে মেটায়। ১৩ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব থেকে টনপ্রতি ৮৬১ দশমিক ৫০ ডলারে ৪০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেয়। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরলে শুধু আমদানি মূল্যই দাঁড়ায় কেজিপ্রতি প্রায় ১০৬ টাকা, পরিবহন ও হ্যান্ডলিং খরচ বাদে।
প্রস্তাবিত যৌথ উদ্যোগের লক্ষ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে সার সংগ্রহের সুযোগ খোঁজা। তবে এর ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়া নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ, ঋণের সুদ, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়নিশ্চয়তার আর্থিক প্রভাবের ওপর।
২০০৬ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙাদিয়ায় ৬৬ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড দেশের একমাত্র ডিএপি উৎপাদনকারী কারখানা। এর বার্ষিক সক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার টন। কিন্তু কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিসিআইসির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ টন, কিন্তু কারখানাটি উৎপাদন করেছে মাত্র ৪০ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো উৎপাদন হয়নি,ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে ২৮ জুন থেকে কারখানাটি বন্ধ আছে। প্রস্তাবিত সৌদি কারখানায় এমন ব্যাঘাত এড়াতে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে জানায়, বিদেশে সরাসরি কোনো শিল্পকারখানায় বিনিয়োগের নজির সরকারের নেই। প্রস্তাবিত সৌদি প্রকল্প হতে পারে এমন প্রথম উদ্যোগ। বিদেশে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিধি মানতে হবে, যার মধ্যে ১০ হাজার ডলারের বেশি বিনিয়োগের জন্য অনুমোদন নেওয়াও রয়েছে। ফলে বিনিয়োগ অনুমোদন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ঋণদায় ও সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকল্পের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ভর করবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর।

