আপনি আজ বাজারে গেলে মাছের অভাব দেখবেন না। রুই, পাঙাশ, তেলাপিয়া, এমনকি পাবদা আর শিংও মিলবে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন, যা প্রথমবারের মতো ৫০ লাখ টনের সীমা ছাড়িয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্পে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে: যে মাছ আমরা খাচ্ছি, তার বড় অংশ আসছে পুকুর থেকে চাষের মাছ, আর যে নদী, বিল আর হাওর থেকে একসময় প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মাছ আসত, সেগুলো কি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে? আরডিআরসির এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৮১টি নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পুরোপুরি শুকিয়ে যায়।তাহলে নদী কি তবে বিলুপ্তির পথে? চলুন,যুক্তি আর সংখ্যাগুলো একটু খুলে দেখি।
রেকর্ডের পেছনে আসলে কী ঘটছে
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, কৃষি জিডিপিতে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে মানুষ দিনে মাথাপিছু ৬৭.৮০ গ্রাম মাছ পাচ্ছে, যেখানে চাহিদা ধরা হয় ৬০ গ্রাম। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি।
২০১০-১১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩০ লাখ ৬২ হাজার টন, সেই হিসাবে এখন প্রায় ৬৪ শতাংশ বেশি। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম, আর অধিদপ্তরের তথ্যে মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে এই একটি মাছ থেকে।
কিন্তু একটা খটকা থেকে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অংশ ২০১৯ অর্থবছরের ২ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে ২ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমেছিল। উৎপাদন বাড়লে অর্থনীতিতে এর ওজন সব সময় সমানতালে বাড়ে না, তাই শুধু টনের হিসাব দেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ কম।
পুকুর বড় হলো, নদী ছোট হলো
আজকের ছবিটা বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক পরিসংখ্যান বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে মোট উৎপাদনের ৬২ দশমিক ৫৯ শতাংশ আসত নদী, বিল, হাওরের মতো উন্মুক্ত জলাশয় থেকে।
২০২৩ থেকে ২৪ অর্থবছরে সেই অংশ নেমেছে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশে। এর বিপরীতে চাষের মাছ এখন মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয়, যা ১৯৮০ দশকের শুরুতে ছিল মাত্র ১৬ শতাংশের মতো। হ্যাচারি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের তেলাপিয়া, রুই ও পাঙাশ আর বেসরকারি বিনিয়োগ এই বদল ঘটিয়েছে।চাষের মাছ দেশকে আমিষ ঘাটতি থেকে বাঁচিয়েছে।
কিন্তু শুধু চাষের মাছের ওপর নির্ভর করলে নদী ও বিলের জীববৈচিত্র্য আর ছোট দেশি প্রজাতি হারায়,জেলেদের আয় কমছে,অনেকে বাধ্য হয়ে জীবিকার জন্য অন্য কাজ খুঁজছেন।
দশ গুণ ফলনের ফাঁদ
এখানে একটা হিসাব আছে, যা পুরো বিতর্কের মূল জায়গাটা ধরিয়ে দেয়। দেশে উন্মুক্ত জলাশয়, অর্থাৎ নদী, খাল, বিল, হাওর ও প্লাবনভূমি মিলিয়ে আছে প্রায় ৪০ লাখ হেক্টর।
চাষের জলাশয়, অর্থাৎ পুকুর ও অন্যান্য চাষযোগ্য জলাশয় মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। এর মানে, জলাশয়ের আয়তনের প্রায় ৮০ শতাংশ উন্মুক্ত জলাশয়, অথচ মাছের এক তৃতীয়াংশের কম আসে সেখান থেকে।
হেক্টরপ্রতি ফলন চাষের জলাশয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ের প্রায় দশ গুণ। এ কারণেই নীতিনির্ধারক আর বিনিয়োগকারীরা পুকুরের দিকে ঝুঁকছেন।
আবার ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এক চাষি বলেন, এক দশকে মাছের খাবারের বস্তার দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় উঠেছে। অন্যদিকে নদী ও বিলের মাছ প্রকৃতির খাবারে বড় হয়, তাই গ্রামের মানুষের কাছে সেটা ছিল প্রায় বিনা খরচের আমিষ।
যে জলাশয় আর ফিরবে না
এবার আসি সবচেয়ে চমকে দেওয়া হিসাবে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০২ অর্থবছর থেকে ২০২২ থেকে ২৩ অর্থবছর, এই ২১ বছরে বাংলাদেশ ১০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়েছে, যা মোট জলাশয়ের ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
আনুমানিক হিসাবে এর ফলে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন প্রাকৃতিক মাছের সম্ভাব্য উৎপাদন হাতছাড়া হচ্ছে, যার মূল্য ২২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা।
৩ লাখ ৮০ হাজার টন মানে দেশের মোট উৎপাদনের সাড়ে সাত শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ কেজি মাছের বিপরীতে আমরা প্রায় সাড়ে সাত কেজি বাড়তি মাছ পেতে পারতাম, শুধু জলাশয়গুলো টিকিয়ে রাখলেই।
এই হারানোর পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। নদী, খাল ও বিল ভরাট হয়ে আবাসন, শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে চলে যাচ্ছে। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, শহরের পয়ঃবর্জ্য ও কৃষির রাসায়নিকে অনেক জলপথ বিষাক্ত হয়েছে। আর কারেন্ট জালের মতো অবৈধ সরঞ্জামে জাটকা ও দেশি ব্রুড মাছ মারা পড়ছে।
লবণ, বাঁধ আর দূষণ: উপকূলের আলাদা গল্প
উপকূলের কথা আলাদা করে বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা প্রবন্ধে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের নদীর লবণাক্ততা আর বাজারে মাছের সরবরাহের তথ্যে দেখা যায়, লবণাক্ততা বদলের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সহজলভ্যতা ভিন্নভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। যেসব মাছ লবণ সহ্য করতে পারে, তাদের সংখ্যা তুলনামূলক টিকে থাকে, বাকিদের জন্য কঠিন হয়।
বিশ্বব্যাংকের আর এক প্রতিবেদন অনুযায়ি,এক দশকে লবনাক্ততার পরিমান প্রায় দিগুণ হয়েছে। এতে মাছের জোগান কমেছে প্রায় ৩২.৪%। মাঝারি মাছের পরিমান ৩৫.৫% এবং বড় মাছের পরিমান ৫২.৫%।
বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত লবণাক্ততা সবচেয়ে বেশি থাকে, কারণ তখন বৃষ্টি কম আর উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যায়। কেউ কেউ উজানের বাঁধ আর অবকাঠামোকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন দূষণই মাছের পালিয়ে যাওয়ার বড় কারণ। অর্থাৎ এখানেও প্রাকৃতিক কারণ আর মানুষের তৈরি কারণ দুটিই দায়ী।
পাতে মাছ আছে, কিন্তু সেটা কি আমাদের সেই দেশি মাছ?
২০১৫ সালে আইইউসিএন বাংলাদেশের ২৫৩টি মিঠাপানির মাছের প্রজাতি মূল্যায়ন করে ৬৪টিকে বিপন্ন শ্রেণিতে রেখেছিল, যা প্রায় এক চতুর্থাংশ। এর মধ্যে ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন ও ২৫টি সংকটাপন্ন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সম্প্রতি বলেছেন, মাছের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু মাছের বৈচিত্র্য কমেছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অবৈধ জালের কারণে আহরণের পর প্রায় ৩০ শতাংশ মাছ নষ্ট হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রজনন ও চাষ প্রযুক্তির উন্নয়নে গত দুই দশকে প্রায় ৪১টি বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৯টি এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে।
ঢাকার বাজারে মানভেদে পাবদা ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ও টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মানে, দেশি মাছ হ্যাচারি আর পুকুরে টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা নদী আর বিলে তার ফিরে আসার গ্যারান্টি নয়।তাই হাওরের মতো এলাকায় রক্ষিত অভয়াশ্রম দরকার, কারণ ছোট দেশি প্রজাতির অনেকগুলো পুকুরে সহজে চাষ করা যায় না।
সমাধানের পথ কী, আইনে কী আছে?
দেশি মাছের উৎপাদন ও প্রজনন বাড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত,জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। খাল, বিল, হাওর ও অন্যান্য স্থায়ী জলাশয় পুনঃখননের পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। এতে একদিকে মাছের আবাসস্থল ফিরবে, অন্যদিকে স্থানীয় জেলেদের জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত,মাছের প্রজনন মৌসুমে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে হবে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ ধরার ওপর মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কার্যকর উদ্ধোগ নিতে হবে। এ সময়ে ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আদলে জেলে পরিবারগুলোকে ভিজিএফের মাধ্যমে খাদ্যসহায়তা দিতে হবে। এতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে জেলেদের উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত,জলাশয় দূষণ বন্ধে শিল্পকারখানার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রতিটি সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন এবং তা নিয়মিত সচল রাখা নিশ্চিত করতে হবে। জলাশয়ের পাড়ে হিজল, করচসহ দেশীয় গাছ লাগিয়েও মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।
চতুর্থত,বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলাভূমি সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬(ঙ) ধারায় রেকর্ডে জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জমি ভরাট বা শ্রেণি পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইনেও হাওর ও জলাভূমির অবৈধ দখল, ভরাট, অননুমোদিত খনন ও রূপান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়,দেশি মাছ রক্ষায় বাংলাদেশের আইনি কাঠামো একেবারে দুর্বল নয়। বরং বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আইনের বাস্তব প্রয়োগ, জলাশয় রক্ষায় প্রশাসনিক তদারকি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি জেলেদের খাদ্যসহায়তা দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেটি কাজে লাগিয়ে দেশি ছোট মাছের ক্ষেত্রেও কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব।
শেষ কথা
সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালে ৬৫ লাখ টন ও ২০৪১ সালে ৮৫ লাখ টন মাছ উৎপাদন। এই লক্ষ্যে চাষের মাছ বড় ভূমিকা রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সতর্কতা হলো, শুধু পুকুরের ওপর ভর করলে পানির সংকট বাড়বে, বাস্তুতন্ত্র আরও ঝুঁকিতে পড়বে, আর কৃষির স্থিতিশীলতাও নড়ে যেতে পারে।
আজ বাজারে মাছ পাচ্ছেন বলে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ কম। যে নদী আর বিল থেকে আমাদের মাছের ঐতিহ্য এসেছে, সেগুলো না বাঁচলে “মাছে ভাতে বাঙালি” কথাটা একদিন শুধু প্রবাদ হয়েই থাকবে।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

