এককালীন কিছু টাকা বিনিয়োগ করে নিয়মিত বিরতিতে আয় পেতে চান, এমন ব্যক্তিদের জন্য তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একটি বিকল্প হতে পারে। তিন বছর মেয়াদি এ সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পে প্রতি তিন মাসে মুনাফা তোলার সুযোগ রয়েছে। মেয়াদ শেষে বিনিয়োগের মূল টাকাও ফেরত পাওয়া যায়। নিয়মিত আয় প্রয়োজন এমন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, মধ্যবিত্ত পরিবার কিংবা অন্যান্য সঞ্চয়কারীদের কাছে এ সুবিধা আকর্ষণীয় হতে পারে।
এ সঞ্চয়পত্রের মূল্যমান এক লাখ, দুই লাখ, পাঁচ লাখ ও ১০ লাখ টাকা। প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক একক বা যৌথ নামে এটি কিনতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কিছু প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগের সুযোগ পায়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তবে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে এই স্কিমের বিনিয়োগ মিলিয়ে নির্দিষ্ট সম্মিলিত সীমাও রয়েছে। একক নামে তিনটি স্কিমে মোট বিনিয়োগের সীমা ৫০ লাখ এবং যৌথ নামে এক কোটি টাকা।
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে এ সঞ্চয়পত্র কেনা এবং নগদায়ন করা যায়।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ হার অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের তিন বছর মেয়াদপূর্তির মুনাফার হার সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। এ সীমার বেশি বিনিয়োগে হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। প্রথম ও দ্বিতীয় বছর শেষে নগদায়ন করলে প্রযোজ্য মুনাফার হার তুলনামূলক কম। প্রথম বছর শেষে তা যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬৫ ও ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছর শেষে ১১ দশমিক ২২ ও ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
সহজ হিসাবে, তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ করে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ হারে এক লাখ টাকা বিনিয়োগে মোট ৩৫ হাজার ৪৬০ টাকা মুনাফা পাওয়া যায়। এই মুনাফা একবারে নয়, প্রতি তিন মাসে কিস্তিতে দেওয়া হয়। তবে হাতে পাওয়া অর্থ থেকে প্রযোজ্য উৎসে কর কেটে রাখা হবে।
প্রয়োজনে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেও সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে পুরো মেয়াদের মুনাফার হার পাওয়া যাবে না। যত দিন বিনিয়োগ রাখা হয়েছে, সেই সময়ের জন্য নির্ধারিত হারে মুনাফা হিসাব করা হবে। আগে বেশি হারে মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে অতিরিক্ত অর্থ মূল টাকা থেকে কেটে সমন্বয় করা হবে। তাই জরুরি প্রয়োজনে বিনিয়োগ ভাঙানোর সম্ভাবনা থাকলে আগেই এ নিয়মটি বিবেচনায় রাখা দরকার।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কর কাটা হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী সাধারণ উৎসে করের হার ১০ শতাংশ। তবে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে না পারলে আইনের ১৪২ ধারা অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে করের হার ৫০ শতাংশ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ১০ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর কাটা হতে পারে। তাই বিষয়টি শুধু টিআইএন থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভর করে না, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় হলো, ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা উৎসে করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এটি অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। ফলে আয়কর রিটার্নে মোট আয় ও প্রকৃত করদায় হিসাব করার সময় আগে কেটে রাখা অর্থ সমন্বয় করা যাবে। প্রকৃত করদায়ের চেয়ে বেশি কর কাটা হলে নিয়ম অনুযায়ী ফেরত পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র কেনার সময় নমিনি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ক্রেতার মৃত্যু হলে নমিনি চাইলে সঙ্গে সঙ্গেই সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করে অর্থ তুলতে পারেন। আবার চাইলে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র চালু রেখে প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা তুলতে পারেন। এ কারণে বিনিয়োগের পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যায়।
সব মিলিয়ে, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের প্রধান আকর্ষণ হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর আয় পাওয়ার সুযোগ এবং মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত পাওয়া। তবে বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক প্রয়োজন, সম্ভাব্য মেয়াদ, আগাম নগদায়নের শর্ত এবং করের প্রভাব হিসাব করে নেওয়া জরুরি।

