আয়কর রিটার্নসংক্রান্ত জটিলতায় ২০২৩ সাল থেকে নিজেদের ৩৮টি যানবাহনের কাগজপত্র নবায়ন করতে পারছে না বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এ কারণে কয়েকটি গাড়ির বিরুদ্ধে জরিমানার নোটিশও পেয়েছে সংস্থাটি। সরকারি অর্থে পরিচালিত অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয় বলে দাবি করছে বিসিক। এই যুক্তিতে আয়কর রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আবারও আবেদন করেছে তারা।
এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে বিসিক জানিয়েছে, করপোরেশনকে কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার আওতায় কোম্পানি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১২ জুন বিসিকের নামে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন নেওয়া হয়। কিন্তু বিসিকের দাবি, সংস্থাটি বাণিজ্যিক মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় না এবং এর কার্যক্রম চলে সরকারি অর্থায়নে। ফলে আয়কর আইনে নির্দিষ্ট সরকারি সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য যে রিটার্ন দাখিলের অব্যাহতির বিধান রয়েছে, বিসিকও সেই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।
রিটার্নসংক্রান্ত এই জটিলতার প্রভাব পড়েছে বিসিকের দৈনন্দিন কাজেও। সংস্থাটির টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্টভুক্ত (টিওঅ্যান্ডই) ৩৮টি যানবাহনের কাগজপত্র ২০২৩ সাল থেকে নবায়ন করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকটি গাড়ির বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জরিমানার নোটিশ দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। বিসিকের লজিস্টিকস বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক সামিউল ইসলাম সমকালকে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এনবিআরকে তিন দফায় চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিভাগে গিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান মেলেনি।
তবে আয়কর আইনে অব্যাহতির বিষয়টি শুধু সরকারি সংস্থা বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বর্তমানে কার্যকর আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারার উপধারা ২ অনুযায়ী, আইন বা সরকারি আদেশে প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থা রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতি পেতে পারে, যদি তারা কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা না করে এবং পরিচালন ব্যয়ের আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থের জন্য নিয়মিত সরকারি তহবিল পায়। বিসিক ২০২৩ সালের নিজস্ব আইন অনুযায়ী একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। তবে ওই আইনেই শিল্পনগরীর জমি ও প্লট বরাদ্দ, ভাড়া বা ইজারা দেওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ফি আদায়ের সুযোগ রয়েছে। সংস্থাটির তহবিলে সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ফি, ঋণ, অনুদান ও অন্যান্য বৈধ উৎসের অর্থ জমার বিধানও আছে। ফলে বিসিক বাস্তবে কী ধরনের আয় করে এবং তার কার্যক্রম আয়কর আইনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমসংক্রান্ত শর্তের মধ্যে পড়ে কি না, তা যাচাই করেই অব্যাহতির যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং কোনো সেবা পাওয়ার জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখানো এক বিষয় নয়। আয়কর আইনের ২৬৪ ধারায় মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস নবায়নের সময় রিটার্ন জমার প্রমাণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে একই ধারার উপধারা ৪ অনুযায়ী, এনবিআর সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই প্রমাণ জমা দেওয়া থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। এ ধরনের নজিরও রয়েছে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল এনবিআর অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ) রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ উপস্থাপন থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে এটি রিটার্ন দাখিলের সামগ্রিক বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি নয়, শুধু নির্দিষ্ট কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখানোর শর্ত থেকে ছাড়।
বিসিকের আবেদনের বিষয়ে এনবিআরের করনীতি বিভাগের সদস্য ছাবিনা ইয়াসমিন সমকালকে জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে আইনে অব্যাহতির সুযোগ থাকলে বিসিক অবশ্যই তা পাবে। তিনি আবেদনটি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, বিসিকের প্রকৃত আয় ও কার্যক্রম আয়কর আইনের শর্ত পূরণ করে কি না এবং ৩৮টি যানবাহনের কাগজপত্র নবায়নের জন্য আলাদা প্রশাসনিক ছাড় দেওয়া সম্ভব কি না। এনবিআরের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে এই জটিলতার সমাধান।

