যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় পর্যাপ্ত কোচ নেই বাংলাদেশ রেলওয়ের। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে পুরোনো ও অচল কোচের কারণে যাত্রীসেবা পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিনের এই সংকট কাটাতে এবার ২০০টি নতুন মিটারগেজ কোচ কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। এ জন্য ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে অর্থায়ন করতে পারে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে শুধু যাত্রীবাহী কোচ কেনার বিষয়ই থাকছে না। রেলের দুর্ঘটনা মোকাবিলা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম উন্নত করতে চারটি উদ্ধারকারী ক্রেন এবং চারটি বিশেষ চাকা মেরামতের যন্ত্র কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এটি যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে কোচ ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হবে।
১ হাজার ২৮২ কোচের মধ্যে সচল মাত্র ৬৮১টি
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটির বহরে মোট ১ হাজার ২৮২টি মিটারগেজ কোচ রয়েছে। তবে এর মধ্যে চলাচলের উপযোগী অবস্থায় রয়েছে মাত্র ৬৮১টি। সচল কোচগুলোরও অনেকটির অবস্থা সন্তোষজনক নয়।
ফলে যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত কোচ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো কোচের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রেলের নিয়মিত কার্যক্রমেও চাপ সৃষ্টি করছে।
রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে ২০০টি নতুন মিটারগেজ কোচ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে রেলের বিদ্যমান বহরের সক্ষমতা বাড়বে এবং যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কেনা হবে চারটি ক্রেন
নতুন কোচের পাশাপাশি রেলপথে দুর্ঘটনা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় চারটি উদ্ধারকারী ক্রেন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
রেললাইন থেকে ট্রেনের বগি ছিটকে পড়া কিংবা অন্য কোনো পরিচালনাগত দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমে এসব ক্রেন ব্যবহার করা যাবে। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে রেলওয়ের উদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া চারটি বিশেষ চাকা মেরামতের যন্ত্র সংগ্রহ করা হবে। এসব যন্ত্রের সাহায্যে কোচের নিচের অংশ থেকে চাকা আলাদা না করেই প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা সম্ভব।
এর ফলে মেরামতের সময় কমতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় কোচ অচল থাকার সমস্যাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
যাত্রীসেবায় কী পরিবর্তন আসতে পারে
নতুন কোচ সংগ্রহ করা গেলে রেলওয়ে বিদ্যমান ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করতে পারবে। প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলে নতুন ট্রেন পরিচালনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নতুন কোচ কেনার মাধ্যমেই রেলের সব সমস্যা দূর হবে না। কোচগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা এবং সুষ্ঠু পরিচালনাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
রেল খাতের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোচ সংগ্রহের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, যাত্রীসেবার মান ধরে রাখতে আধুনিক সরঞ্জাম ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন।
রেলের উন্নয়নে এডিবির সহযোগিতা
বাংলাদেশের রেল খাতের উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। রেলপথের অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন কোচ সংগ্রহ এবং পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগে সংস্থাটির সহযোগিতা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটিও রেলের আধুনিকায়ন কার্যক্রমের অংশ। এর মাধ্যমে পুরোনো কোচের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যাত্রী পরিবহনব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে প্রকল্পটি এখনো অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া, ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং নির্ধারিত সময়ে কোচ ও সরঞ্জাম সরবরাহের ওপরই এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পূর্বাঞ্চলের রেলসেবায় কোচ সংকট কিছুটা কমার পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

