সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে টাকার প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার সূচক বেড়ে ১০৬ দশমিক ২৯-এ পৌঁছেছে। এর অর্থ, প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় টাকার মূল্য নির্ধারিত ভিত্তিমানের চেয়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হলে টাকার বিনিময় হার কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ডলারের বিপরীতে টাকার তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।
প্রকৃত বিনিময় হার কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার হলো এমন একটি সূচক, যার মাধ্যমে একটি দেশের মুদ্রার মূল্য প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মুদ্রার তুলনায় পরিমাপ করা হয়। এতে শুধু মুদ্রার নামমাত্র বিনিময় হার নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির পার্থক্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এই সূচকের ভিত্তিমান ১০০। সূচক ১০০-এর ওপরে থাকলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট মুদ্রাকে অতিমূল্যায়িত এবং ১০০-এর নিচে থাকলে অবমূল্যায়িত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে ১৭টি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের মুদ্রার সমন্বয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে মূল্যস্ফীতির পার্থক্য সমন্বয় করে সূচকটি নির্ধারণ করা হয়।
গত সেপ্টেম্বরে সূচক ১০৬ দশমিক ২৯-এ পৌঁছানোয় টাকার প্রকৃত মূল্য ভিত্তিমানের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি বলে উঠে এসেছে।
ডলারের বিনিময় হারেও ব্যবধান
গত সেপ্টেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ১২১ টাকা ৮৭ পয়সা। তবে প্রকৃত বিনিময় হার সূচকের ভিত্তিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিনিময় হার হওয়ার কথা ছিল ১২৩ টাকা ৩ পয়সা।
অর্থাৎ, প্রচলিত বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির পার্থক্য বিবেচনায় পাওয়া নির্দেশক হারের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পার্থক্য দীর্ঘদিন বজায় থাকলে বাংলাদেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করতে হতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ যেসব রপ্তানি খাত মূলত কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করে, সেসব খাত বেশি চাপে পড়তে পারে।
আমদানি ব্যয় কম রাখতে টাকার শক্তিশালী অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখার একটি বড় সুবিধা হলো আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কারণ জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির মতো আমদানি পণ্যের মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ ডলার কিনতে আমদানিকারকদের বেশি টাকা খরচ করতে হবে। এতে আমদানি করা পণ্যের স্থানীয় দামও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকৃত বিনিময় হার অনুযায়ী টাকার অবমূল্যায়ন করা হলে আমদানি করা পণ্যের জন্য স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ কারণে নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার বজায় রাখার সুবিধা রয়েছে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিই প্রধান কারণ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
তাঁর মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর তুলনায় বেশি থাকলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে। ফলে টাকার নামমাত্র বিনিময় হার অপরিবর্তিত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যায়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত বিনিময় হার দীর্ঘদিন উচ্চ অবস্থানে থাকলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে অতিমূল্যায়িত টাকা প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে তুলনামূলক কম টাকা পাওয়া গেলে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নাকি রপ্তানি সক্ষমতা—কোনটিতে অগ্রাধিকার?
বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমন্বয়ের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে টাকার শক্তিশালী অবস্থান দীর্ঘদিন বজায় থাকলে রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
এ কারণে শুধু বিনিময় হার পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ধরে রাখা। টাকার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হবে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

