একসময় দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। জাতীয় রপ্তানিতে এ অঞ্চলের অবদান ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। কিন্তু দুই দশকের ব্যবধানে সেই অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় সংকুচিত হচ্ছে শিল্পটির পরিধি। সর্বশেষ আরও পাঁচটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে নিবন্ধিত পোশাক কারখানা ছিল ৬৯৯টি। এর মধ্যে সচল ছিল ৬১০টি। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সচল কারখানার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৩৬টিতে। অর্থাৎ ২১ বছরে সচল কারখানা কমেছে ২৭৪টি।
শুধু গত দুই বছরেই বন্ধ হয়েছে ২৭টি পোশাক কারখানা। চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক। ফলে কারখানা বন্ধের প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, সরাসরি আঘাত হানছে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট থেকে ব্যাংকঋণের চাপ
শিল্পমালিকদের মতে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, ঋণপত্র খুলতে সমস্যা, বিদেশি ক্রেতাদের কার্যাদেশ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।
এর পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষ ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি চাপে রয়েছে। বড় কারখানা থেকে চুক্তিভিত্তিক কাজ নিয়ে উৎপাদন চালানো অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না পাওয়ায় টিকে থাকতে পারছে না।
শিল্পমালিকদের অভিযোগ, কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন ও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ—প্রতিটি পর্যায়েই ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো যাচ্ছে না।
জাতীয় পোশাক রপ্তানিতে চট্টগ্রামের অংশ কমে ৯ শতাংশ
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম বলেন, একসময় দেশের তৈরি পোশাক খাতে চট্টগ্রামের অবদান ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
তাঁর মতে, এটি চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। কারখানা বন্ধের প্রবণতা ঠেকাতে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শুধু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বর্তমানে সচল কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
কার্যাদেশের অভাবে বেশি ঝুঁকিতে ছোট কারখানা
চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পে বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বহু ছোট ও মাঝারি কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ বড় কারখানার কাছ থেকে সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নিয়ে উৎপাদন পরিচালনা করে।
কিন্তু বড় কারখানাগুলো নিজেরাই পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না পেলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও কমে যায়। এতে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন, কারখানার ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজিএমইএর পরিচালক এমডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে পোশাক কারখানাগুলো পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছোট কারখানাগুলো বেশি সমস্যায় রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা কম দামে পণ্য সরবরাহের জন্য চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ
উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও উদ্যোক্তাদের আলোচনায় এসেছে।
বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, সরকার পোশাকশ্রমিকদের বেতন বার্ষিক ৯ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলছে। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে আরও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তাঁর মতে, চট্টগ্রামের পোশাকশিল্প ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাই শিল্পের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কারখানা টিকিয়ে রাখা এবং শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা—দুই দিক বিবেচনা করেই সমাধান খুঁজতে হবে।
কারখানা বন্ধে বাড়ছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
একটি পোশাক কারখানা বন্ধ হলে শুধু উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এর সঙ্গে যুক্ত পরিবহন, খাবারের দোকান, বাসাভাড়া এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন একই কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। কাজ হারানোর পর অনেককে পেশা পরিবর্তন করতে হয় কিংবা দীর্ঘ সময় বেকার থাকতে হয়।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া ২৭টি কারখানায় ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। ফলে এই সংকট স্থানীয় অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও চাপ তৈরি করছে।
ঘুরে দাঁড়াতে কী প্রয়োজন?
চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ ব্যাংকঋণ, দ্রুত ঋণপত্র খোলার সুযোগ এবং নতুন রপ্তানি কার্যাদেশ সংগ্রহের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং সাবকন্ট্রাক্টের কাজ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পণ্যের বৈচিত্র্য আনার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে উপস্থাপনের জন্য একটি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
২০০৫ সালে ৬১০টি সচল কারখানা থেকে ২০২৬ সালে মাত্র ৩৩৬টিতে নেমে আসার চিত্র চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সংকট স্পষ্ট করে। এখন বড় প্রশ্ন, অবশিষ্ট কারখানাগুলোকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কতগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

