থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়লেও দুই দেশের আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। দেশটি থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি এখনো সীমিত। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে থাইল্যান্ডের বাজারে ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ ৬ কোটি ১৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে দেশটি থেকে আমদানি করেছে ৭৯ কোটি ৬ লাখ ডলারের পণ্য। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ।
এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬ কোটি ৪২ লাখ ডলার এবং আমদানি ছিল ৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৭ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পণ্য। ওই বছর আমদানির পরিমাণ ছিল ৯৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের আমদানি কমলেও দেশটিতে রপ্তানি বাড়েনি। বরং রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
শুল্ক কমানোর প্রস্তাব বাংলাদেশের
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে থাইল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত শুক্রবার ব্যাংককে অনুষ্ঠিত দুই দেশের চতুর্থ পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠকে বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি বাড়ানো এবং সেগুলোর ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। থাইল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব একসিরি পিন্তারুচি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করার অনুরোধ জানিয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশের ওষুধ ও পাটশিল্পে রপ্তানি সক্ষমতা থাকায় এই দুই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে থাইল্যান্ডের বাজারে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্য নিবন্ধন এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন শর্ত সহজ করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও থাইল্যান্ডের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ
বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনায় শুধু ওষুধ ও পাটপণ্য নয়, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণে থাইল্যান্ডের কারিগরি সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ চেয়েছে বাংলাদেশ।
বিশেষ করে বৈশ্বিক হালাল খাদ্যের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রযুক্তি বিনিময়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আতিথেয়তা, নার্সিং, কৃষির জার্মপ্লাজম এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণে থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও সহযোগিতার আগ্রহ
জ্বালানি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি অবশিষ্টাংশ ও কৃষিশিল্পের বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।
এ ধরনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষি বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ এখনো আমদানির তুলনায় অনেক কম। ফলে শুধু আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মতো খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুল্ক সুবিধা, মান নিয়ন্ত্রণের শর্ত পূরণ, পণ্যের নিবন্ধন এবং থাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হয়ে রপ্তানি আয় কতটা বাড়াতে পারে, সেটিই হবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

