সঞ্চিত অর্থ থেকে মুনাফা পেতে চান, কিন্তু বিনিয়োগ হতে হবে ইসলামি শরিয়াহর নীতিমালা অনুযায়ী—এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। তবে কোথায় বিনিয়োগ করলে অর্থ তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে, কোন খাতে কতটা ঝুঁকি রয়েছে এবং কীভাবে সঠিক প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে হবে, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং কিছু বিনিয়োগ তহবিলে অর্থের অপব্যবহারের ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের একাধিক পথ রয়েছে। তবে সব বিনিয়োগে ঝুঁকি ও মুনাফার সম্ভাবনা সমান নয়। বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক সক্ষমতা, অর্থের প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য ক্ষতি বহনের সামর্থ্য বিবেচনা করা জরুরি।
ইসলামি ব্যাংকে বিনিয়োগের সুযোগ
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পরিচিত মাধ্যমগুলোর একটি ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ইসলামি ব্যাংকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অর্থ জমা রেখে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত তিন মাস থেকে কয়েক বছর মেয়াদে বিভিন্ন ধরনের আমানত হিসাব খোলা যায়। বিনিয়োগকারী কত দিন অর্থ জমা রাখতে চান, তার ভিত্তিতে মেয়াদ নির্বাচন করতে পারেন।
তবে দেশের কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকে অতীতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিছু ইসলামি ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কতটা শরিয়াহসম্মত ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অবশ্য এসব অনিয়মের দায় সাধারণ আমানতকারীদের নয়। সংশ্লিষ্ট সময়ের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং শরিয়াহ তদারকি পরিষদের দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত ব্যাংকেও রয়েছে শরিয়াহভিত্তিক সেবা
শুধু পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক নয়, দেশের কয়েকটি প্রচলিত ব্যাংকও শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকে।
এসব সেবার কার্যক্রম ইসলামি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য শরিয়াহ তদারকি পরিষদ থাকে।
ফলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং সুশাসনসম্পন্ন কোনো ব্যাংকের শরিয়াহভিত্তিক সেবাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে শুধু শরিয়াহভিত্তিক সেবার নাম থাকলেই অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, আমানতের শর্ত, মুনাফা বণ্টনের পদ্ধতি এবং অর্থ উত্তোলনের সুবিধা যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ব্যাংকের আমানতে মুনাফার হার তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী বিকল্প মাধ্যমের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
সরকারি সুকুকে বিনিয়োগের সুযোগ
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সরকারি সুকুক।
সুকুক হলো সম্পদ বা প্রকল্পভিত্তিক একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা। এতে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নির্দিষ্ট সম্পদ, জমি বা উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বিনিয়োগের কাঠামো অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সম্পদ থেকে অর্জিত আয় বা ভাড়ার ভিত্তিতে মুনাফা দেওয়া হয়।
মেয়াদ শেষে নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের অংশ পুনঃক্রয়ের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য সুকুক ইস্যু করে থাকে।
সরকারি সুকুকে সাধারণত ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা থেকে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। আলোচিত ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত নেই।
তবে প্রতিটি সুকুকের শর্ত, মেয়াদ এবং বিনিয়োগের নিয়ম আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি সুকুক কিনবেন যেভাবে
সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করতে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে সুকুক বিনিয়োগকারী পরিচিতি হিসাব খুলতে হয়।
এই পরিচিতি পাওয়ার পর সরকার নতুন সুকুক ইস্যু করলে বিনিয়োগকারী ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন।
ব্যাংক বিনিয়োগকারীর পক্ষে নিলামে অংশ নেয়। আবেদন সফল হলে নির্ধারিত পরিমাণ সুকুক বরাদ্দ পাওয়া যায়।
তবে সরকারি সুকুকের চাহিদা অনেক সময় বেশি থাকে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একই সঙ্গে অংশ নেওয়ায় আবেদন করলেই বরাদ্দ নিশ্চিত হয় না।
সরকারি সুকুক তুলনামূলক কম ঋণঝুঁকির বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অর্থ তুলে নেওয়া সব সময় সহজ নয়।
তাই যে অর্থ দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে না, সেটিই এ ধরনের বিনিয়োগে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বেসরকারি সুকুকে মুনাফার সম্ভাবনা
সরকারের পাশাপাশি দেশের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সুকুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে।
এসব সুকুকে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নতুন সুকুক ইস্যু করলে।
তবে বেসরকারি সুকুক কেনার আগে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার অবস্থা, পূর্ববর্তী ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং বিনিয়োগের শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ সরকারি ও বেসরকারি সুকুকের ঝুঁকি এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীর মুনাফা কিংবা মূলধন ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
শরিয়াহভিত্তিক যৌথ বিনিয়োগ তহবিল
যাঁরা সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চান না, তাঁদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক যৌথ বিনিয়োগ তহবিল আরেকটি বিকল্প।
বাংলাদেশে আইডিএলসি, প্রাইম ব্যাংক, শান্তা, এজ, আইসিবি, সন্ধানী এবং এশিয়ান টাইগার সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহভিত্তিক উন্মুক্ত যৌথ বিনিয়োগ তহবিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের তহবিলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ একত্র করে পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপকেরা শরিয়াহসম্মত শেয়ার, সুকুক এবং অনুমোদিত অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করেন।
বিনিয়োগ থেকে আয় হলে তহবিলের নীতিমালা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পেতে পারেন।
উন্মুক্ত যৌথ বিনিয়োগ তহবিলের একটি সুবিধা হলো, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিনিয়োগের অংশ ফেরত দিয়ে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকে।
তবে এখানে শেয়ারবাজারের ঝুঁকি রয়েছে। বাজারে শেয়ারের দাম কমে গেলে তহবিলের সম্পদমূল্যও কমতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
অতীতের অনিয়ম থেকে সতর্ক থাকার প্রয়োজন
দেশের যৌথ বিনিয়োগ তহবিল খাতে অতীতে কিছু তহবিল ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকটি তহবিলে এমন সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, যেগুলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এ ধরনের ঘটনা বিনিয়োগ তহবিলের প্রতি মানুষের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে।
তবে অতীতের অনিয়ম ঠেকাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিভিন্ন তদারকিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
বিশেষ করে তহবিলের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণে ট্রাস্টিদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
ফলে তহবিল ব্যবস্থাপকদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি জোরদার হয়েছে। তবে অনিয়মের ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয়েছে, এমনটি বলা যায় না।
বিনিয়োগের আগে তহবিল ব্যবস্থাপকের সুনাম, অতীতের কার্যক্রম, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, বিনিয়োগ নীতি এবং তহবিলের সম্পদমূল্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বিকল্প বিনিয়োগেও রয়েছে ঝুঁকি
বাংলাদেশে কিছু গণঅর্থায়ন ও বিকল্প বিনিয়োগের মাধ্যমেও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
এসব ব্যবস্থায় সাধারণত একাধিক বিনিয়োগকারীর অর্থ সংগ্রহ করে ছোট বা মাঝারি ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়।
ব্যবসা লাভজনক হলে চুক্তি অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পেতে পারেন। তবে ব্যবসায় লোকসান হলে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অতীতে এ ধরনের অর্থায়ন পাওয়া কিছু ছোট প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারেনি।
তাই এ ধরনের বিনিয়োগে অংশ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং চুক্তির শর্ত যাচাই করা জরুরি।
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের কিছু কাঠামোতে লাভের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির ঝুঁকিও বিনিয়োগকারীকে বহন করতে হয়। ফলে সম্ভাব্য বেশি মুনাফার আশায় নিজের সামর্থ্যের বাইরে ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।
জমি ও আবাসন খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ
পর্যাপ্ত মূলধন থাকলে জমি বা আবাসন খাতও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের একটি মাধ্যম হতে পারে।
তবে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগে মালিকানা, দলিল, নিবন্ধন, অনুমোদন এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই খাতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, প্রয়োজনের সময় দ্রুত সম্পদ বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ব্যাংকের আমানত বা উন্মুক্ত বিনিয়োগ তহবিলের তুলনায় জমি ও আবাসন খাতে অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকার আশঙ্কা বেশি।
তাই জরুরি প্রয়োজনের অর্থ জমি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ না করাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বিনিয়োগের আগে যেসব বিষয় বিবেচনা জরুরি
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মুনাফার হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের নিরাপত্তা, অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে বিনিয়োগটি সত্যিই শরিয়াহর নীতিমালা অনুসরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও শরিয়াহ তদারকির ব্যবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সব অর্থ একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি খাতে বিনিয়োগ না করে প্রয়োজন ও ঝুঁকি বহনের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন মাধ্যমে ভাগ করে রাখলে কোনো একটি বিনিয়োগে ক্ষতির প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব হতে পারে।
নিরাপত্তা ও মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ
শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের জন্য ইসলামি ব্যাংক, সরকারি ও বেসরকারি সুকুক, যৌথ বিনিয়োগ তহবিল, বিকল্প অর্থায়ন এবং জমি-আবাসনের মতো একাধিক সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রতিটি মাধ্যমের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আলাদা। সরকারি সুকুকে তুলনামূলক কম ঋণঝুঁকি থাকতে পারে, অন্যদিকে শেয়ারভিত্তিক তহবিল বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগে বেশি মুনাফার সম্ভাবনার পাশাপাশি ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি।
সুতরাং বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শরিয়াহসম্মত হওয়া মানেই কোনো বিনিয়োগ সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সচেতন সিদ্ধান্ত এবং নিয়মিত তদারকিই বিনিয়োগের অর্থ সুরক্ষিত রাখার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

