দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে কিছুটা গতি ফিরেছে। সদ্য শেষ হওয়া অক্টোবর মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা।
সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে প্রবাসী আয় বেড়েছে। তবে ইতিবাচক এই পরিবর্তনের পরও টানা পাঁচ মাস ধরে মাসিক প্রবাসী আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে রয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে প্রবাসী আয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশে মোট ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে এসেছিল ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ডলার।
সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১০ কোটি ৭৬ লাখ ১০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে প্রবাসী আয় প্রায় ১০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার বেশি এসেছে।
অর্থাৎ মাসিক ও বার্ষিক উভয় তুলনাতেই অক্টোবরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে।
টানা পাঁচ মাস ৩০০ কোটি ডলারের নিচে
অক্টোবরে প্রবাসী আয় বাড়লেও তা ৩০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে টানা পাঁচ মাস দেশের মাসিক প্রবাসী আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে রয়েছে।
অথচ আগের ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল।
সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কম পর্যায়ে রয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরের বৃদ্ধি প্রবাসী আয়ের গতিপথে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে সবচেয়ে বেশি অর্থ
অক্টোবরে দেশে আসা প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মাসটিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২১২ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৫০ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৩ কোটি ৭৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এই অর্থের পুরোটাই এসেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে।এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলার।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
অক্টোবরে আট ব্যাংকে আসেনি প্রবাসী আয়
সামগ্রিক প্রবাসী আয় বাড়লেও অক্টোবর মাসে দেশের আটটি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো প্রবাসী আয় আসেনি।
এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।
বেসরকারি খাতের দুটি ব্যাংক হলো আইসি ইসলামী ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক।
এ ছাড়া বিদেশি খাতের চারটি ব্যাংকের মাধ্যমেও কোনো প্রবাসী আয় আসেনি। এগুলো হলো ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে এসব ব্যাংকের প্রবাসী আয় সংগ্রহের পরিমাণ ছিল শূন্য।
অর্থবছরের প্রথম চার মাসের চিত্র
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
এরপর আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারে।সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় কিছুটা কমে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ডলারে নেমে আসে।
সর্বশেষ অক্টোবরে তা আবার বেড়ে ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।চার মাসের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫১ লাখ ডলার।
মাসভিত্তিক হিসাবে আগস্টে সবচেয়ে বেশি এবং সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে কম প্রবাসী আয় এসেছে।
আগের অর্থবছরে রেকর্ড প্রবাসী আয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ডলার।অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রবাসী আয়ের ধারা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ
অক্টোবরে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের জন্য ইতিবাচক খবর। তবে টানা পাঁচ মাস ধরে মাসিক আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে থাকায় আগের অর্থবছরের উচ্চ প্রবাহ এখনো ফিরে আসেনি।
বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রবাসী আয় মাসে মাসে ওঠানামা করছে।
আগামী মাসগুলোতে এই প্রবাহ আরও বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর ধারা এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের পরিস্থিতির ওপর।

