স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ টেকসই করতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বাড়তি তিন বছর শুধু প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখলে চলবে না। এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। একই সঙ্গে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকায় সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত এক গণমাধ্যম সংলাপে এসব কথা বলেন সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’। এতে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। আলোচনা পরিচালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে বাড়তি প্রস্তুতির সময় চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। এখন এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে সংস্কার পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভার তদারকি বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কার কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে একটি উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন দেবপ্রিয়। সেখানে কোন মন্ত্রণালয় কী দায়িত্ব পেয়েছে, কখন কোন কাজ শেষ করার কথা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতটুকু, তা নিয়মিত প্রকাশের পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদেরও এসব তথ্য জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এতে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য বোঝা সহজ হবে।
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের মান উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন দেবপ্রিয়। উৎপাদন ও বিনিয়োগ সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থ যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পথে পথে চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার যে ব্যয় বাড়ছে, তা কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
দেবপ্রিয় আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগও একই সময়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, এসব লক্ষ্য আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণকে শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। এই পরিবর্তনের সুফল যেন শুধু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও পরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্ত করতে হবে।
রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক এবং সেবা খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ডের পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান এবং সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি। কারণ, যেসব বিষয় পরিমাপ করা যায় না, সেগুলোর অগ্রগতিও যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, সরকারের ২০২৪ সালের মসৃণ উত্তরণ কৌশল থেকে সিপিডি ২৩টি সংস্কার কার্যক্রম বাছাই করেছে। এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা, রপ্তানি বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা এবং অংশীদারত্বের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পর্যন্ত পাঁচটি ধাপে প্রতিটি উদ্যোগের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই সংস্কার সম্পন্ন হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, কাজ পরিচালনার দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নের বাধাগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। সংস্কারের প্রতিটি পর্যায়ে কী অগ্রগতি হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে থাকা ঘাটতি বোঝা যাবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল এখনো সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বৈষম্যের কারণে অনেক মানুষ উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষসহ সমাজের সব পক্ষকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন। ২০২৯ সালে বাংলাদেশ আবারও বাড়তি সময় পাবে, এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেন তিনি।

