বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে একের পর এক সাফল্য এলেও এ শিল্পের মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকদের মজুরির চিত্র বেশ ভিন্ন। এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকেরা অনেক কম বেতন পান। বর্তমানে মাসিক ন্যূনতম মজুরির হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি পান শুধু শ্রীলঙ্কার শ্রমিকেরা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রায় ১০১ মার্কিন ডলারের সমান। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় এই মজুরি ৯০ ডলার এবং উজবেকিস্তানে ১০৬ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে থাকা দেশগুলোর সঙ্গেও মজুরির ব্যবধান খুব বেশি নয়।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি গড়ে ১৪৫ ডলার। ভিয়েতনামে ১৭৫ ডলার, ভারতে ১৯২ ডলার এবং কম্বোডিয়ায় ২১০ ডলার। ইন্দোনেশিয়ায় এ মজুরি ২২২ ডলার এবং চীনে ৩৩৭ ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কে সর্বনিম্ন মজুরি সবচেয়ে বেশি, মাসে ৬৬২ ডলার।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মজুরির ব্যবধান
তবে বিভিন্ন দেশের মজুরির এই তুলনা করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। সব দেশে শ্রমিকদের জন্য একই ধরনের জাতীয় মজুরি কাঠামো নেই। কোথাও প্রদেশ বা অঞ্চলভেদে, কোথাও কাজের ধরন অনুযায়ী আবার কোথাও নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য আলাদা মজুরি নির্ধারণ করা হয়। ফলে এসব দেশের মজুরির তুলনা মূলত প্রচলিত ন্যূনতম মজুরির ভিত্তিতে করা হয়েছে।
চীনে সারা দেশের জন্য একক ন্যূনতম মজুরি নেই। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও শহর নিজেদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মজুরি নির্ধারণ করে। ২০২৫ সালেও কয়েকটি অঞ্চলে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ভারতেও রাজ্য ও কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি আলাদা। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দেশটিতে কেন্দ্রীয় শ্রমক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা সংশোধন করা হয়েছে।
পাকিস্তানেও প্রদেশভেদে শ্রমিকদের মজুরিতে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সিন্ধু প্রদেশে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৪৩ হাজার রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রদেশ ও জেলাভিত্তিক মজুরি কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়ায় তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি প্রতিবছর আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
ভিয়েতনামেও অঞ্চলভিত্তিক মজুরি কাঠামো রয়েছে। দেশটিতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। একই দিনে কম্বোডিয়াতেও নতুন মজুরি কাঠামো চালু হয়। তুরস্কে সাধারণত প্রতিবছর জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
মজুরি কত, তার পাশাপাশি কত দিন পরপর তা বাড়ানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। চীনে অঞ্চলভেদে সাধারণত দুই বছরের মধ্যে মজুরি সমন্বয় করা হয়। ভিয়েতনামে এক থেকে দুই বছর পর মজুরি পর্যালোচনার প্রবণতা রয়েছে। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কে সাধারণত প্রতিবছর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
ভারতে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মধ্যে মজুরি পর্যালোচনার বিধান থাকলেও পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা ছয় মাস পরপর সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণত তিন বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক সময় এই প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দীর্ঘ হয়।
বাংলাদেশে সর্বশেষ মজুরি নির্ধারণ হয়েছিল ২০২৩ সালে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। এরপর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।
অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক ও শ্রীলঙ্কায় ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও চীনেও অঞ্চলভেদে মজুরি সমন্বয় করা হচ্ছে। ফলে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় পোশাকশ্রমিকদের জন্য চারটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়। প্রথম ধাপে মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা, তৃতীয় ধাপে ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা এবং চতুর্থ ধাপে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ধাপের শ্রমিকদের মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
এই ১২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা। বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৪৫০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা। এ ছাড়া নতুন শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের শিক্ষানবিশকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে তাঁদের মাসিক মোট মজুরি ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা।
সর্বশেষ মজুরি কাঠামোয় মূল বেতনের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির বিধান ছিল। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই হার বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়। অতিরিক্ত ৪ শতাংশ বৃদ্ধি ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে। তবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার বাড়লেও নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি।
শ্রমিকদের দাবি ৩০ হাজার টাকা
এবারের শ্রমিক আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি। বর্তমানে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসাবে শ্রমিকেরা আরও ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমান মজুরির তুলনায় এই দাবি প্রায় ১৪০ শতাংশ বেশি। ৩০ হাজার টাকা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২৪২ ডলারের সমান।
শ্রমিকদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ অনেক বেড়েছে। সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু তাঁদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিককে সংসারের খরচ মেটাতে অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে।
তবে নতুন মজুরি নির্ধারণ নিয়ে মালিকপক্ষেরও উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশের ওঠানামার কারণে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর পক্ষে একসঙ্গে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, মালিকপক্ষ তা মেনে নেবে। তবে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের জন্য কারখানাগুলোকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গেও আলোচনা ও দর-কষাকষি প্রয়োজন হবে।
নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের বর্তমান মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের অনেকের আয় দিয়ে এসব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ঋণ, অপুষ্টি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করা জরুরি। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, কম মজুরির কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন ব্যয় কম রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়, কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ বাড়ে এবং দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন হয়। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই মজুরি বৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পের সামগ্রিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের কাজ হবে শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া এবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

