রপ্তানিমুখী শিল্পের সুবিধার জন্য সরকার পোশাক কারখানাগুলোকে শুল্ক ও কর ছাড়ে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়। কিন্তু সেই সুবিধায় আনা কাপড় যদি রপ্তানির পোশাক তৈরিতে ব্যবহার না হয়ে খোলাবাজারে বিক্রি হয়, তাহলে সরকার রাজস্ব হারায়, আর নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। এমন অনিয়মের অভিযোগে দুই পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। পৃথক তদন্তে প্রতিষ্ঠান দুটির আমদানি, উৎপাদন, গুদামের মজুদ ও রপ্তানির হিসাব মিলিয়ে এসব অসংগতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।
প্রতিষ্ঠান দুটি হলো রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড এবং লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড। এনবিআরের ২ নভেম্বরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এর মধ্যে রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মোট অঙ্কের প্রায় ৯২ শতাংশই এসেছে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। তদন্তকারীরা কারখানা ও গুদাম পরিদর্শনের পাশাপাশি আমদানি, রপ্তানি এবং উৎপাদনের নথি যাচাই করেছেন।
রিয়াজ নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিয়ম পাওয়া গেছে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড়ের হিসাব নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করেছিল। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২৩৭ টন কাপড় কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। আমদানি করা এসব কাপড় দিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরিরও কোনো গ্রহণযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। এনবিআরের দাবি, গুদাম থেকে সরিয়ে এসব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।
অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে ইউডিগুলোর হিসাব পরীক্ষা করে। মোট ৪১টি ইউডির মধ্যে ৩১টিতে কোনো রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ৩০টি ইউডির আওতায় আমদানি করা কাপড়ের পুরোটা সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। অন্যদিকে, আংশিক রপ্তানি হওয়া ১০টি ইউডির ক্ষেত্রেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব মেলেনি। অর্থাৎ শুধু পণ্য আমদানি করেই দায়িত্ব শেষ হয়নি, সেই কাঁচামাল দিয়ে কী উৎপাদন হলো এবং কতটুকু রপ্তানি হলো, তার হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে।
কারখানার সরেজমিন পরিদর্শনে পাওয়া মজুদের তথ্যও এই সন্দেহ বাড়িয়েছে। সেখানে ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া যায়। এই কাপড় প্রতিষ্ঠানের মোট আমদানির মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। এনবিআরের হিসাবে, সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ফাঁকি দেওয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা।
অন্য প্রতিষ্ঠান লিশা টেক্সের ক্ষেত্রেও বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পলিয়েস্টার কাপড়ের বড় অংশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এনবিআরের তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি কাপড় কারখানায় নেই। এসব কাপড়ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে সরিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শুধু এই অনিয়ম থেকেই প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক ও কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের হিসাব এখানেই শেষ নয়। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কম রপ্তানিমূল্য দেখানোর বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ইউডির বাইরে স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং নির্ধারিত ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার তথ্য পাওয়া গেছে। চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল স্থানীয় বাজার থেকে অনুমোদন ছাড়াই কেনা হয়েছে, যার বিপরীতে মূসক বা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি বলে জানিয়েছে এনবিআর। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকির তথ্যও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকা।
বিষয়টি বুঝতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সহজভাবে বললে, রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে, সে জন্য সরকার তাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও প্যাকেজিং সামগ্রী শুল্ক ও কর ছাড়াই আমদানির সুযোগ দেয়। তবে এই ছাড়ের বিনিময়ে কিছু শর্ত থাকে। আমদানি করা কাঁচামাল নির্দিষ্ট উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির হিসাব দেখাতে হবে। কোনো কাঁচামাল রপ্তানিতে ব্যবহার না হলে বা দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে হলে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধের নিয়ম রয়েছে।
এখানেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি করে উৎপাদন ও রপ্তানির যথাযথ হিসাব না রাখলে সরকার বুঝতে পারে না, সেই কাঁচামাল দিয়ে আসলে কত পণ্য তৈরি হয়েছে। কাগজে উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব থাকলেও বাস্তবে কাঁচামাল অন্যত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ থাকে। এতে একদিকে সরকার সম্ভাব্য শুল্ক ও কর থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে বৈধভাবে শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করা ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
এনবিআর জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে সিআইসির এ ধরনের তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে তদন্তে রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উদঘাটন এবং আইনগতভাবে দায় চূড়ান্ত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ এবং বকেয়া শুল্ক ও কর আদায়ের প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রপ্তানি খাতকে সহায়তা করার জন্য দেওয়া কর ছাড় যদি এক শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় বহন করতে হয় রাষ্ট্রকে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিয়ম মেনে ব্যবসা করা উদ্যোক্তারা।

