জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি ক্রমেই বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬: স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু প্রচণ্ড গরমের কারণেই ২০২৫ সালে দেশটি আনুমানিক ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য আয় হারিয়েছে।
রোববার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর) অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট (সিসিএইচপিইউ) কারিগরি সহায়তা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৬-২০০৫ সময়ের তুলনায় শিশু ও বয়স্কদের তাপপ্রবাহের মুখে পড়ার হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২১-২০২৫ সালে প্রতি বছর গড়ে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা ৭.৬ দিন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা ৭.২ দিন তাপপ্রবাহে কাটিয়েছে, যা ১৯৮৬-২০০৫ সময়ের চেয়ে যথাক্রমে ১৬২ ও ১৩৬ শতাংশ বেশি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফন্ডাজিওনে সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ও গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো শৌর্য দাশগুপ্ত। তিনি জানান, ২০১৬-২০২৫ সময়ে অতিরিক্ত গরমের কারণে দেশে বছরে গড়ে ২ হাজার ৬০০ কোটির বেশি সম্ভাব্য শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯০ এর দশকের বার্ষিক গড়ের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২১-২০২৫ সালে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের গরমজনিত মৃত্যুর কারণে বছরে গড়ে ৩৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এটি প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষের এক বছরের আয়ের সমান এবং ২০০০-২০০৪ সময়ের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ।
মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত পিএম ২.৫ বায়ুদূষণে ২০২৩ সালে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এ ধরনের মৃত্যু ৪০ শতাংশ বেড়েছে, আর ২০২৩ সালে এসব মৃত্যুর ৩৭.৫ শতাংশের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি দায়ী ছিল। অন্যদিকে গৃহস্থালির বায়ুদূষণে মৃত্যু কমে ২০২৩ সালে ৭৭ হাজার ৫০০ হয়েছে, ২০১৬ সালে যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০।
একই সময়ে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ ৯.৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকারের নিট ভর্তুকি ছিল ৫.৩ বিলিয়ন ডলার, যা স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২.৯ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট হিসেবে বিবেচনা এবং জলবায়ু পদক্ষেপ ও অর্থায়নে স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০১৬-২০২৫ সময়ে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আগের দশকের চেয়ে দ্রুত বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, প্রতিবেদনটি বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (সিএসডি) নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান বলেন, তাপমাত্রা বাড়ায় কর্মজীবী মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, পাশাপাশি মা ও শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মারিনা রোমানেলো বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিতে অগ্রগতি হলেও জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যক্ষতি যত দ্রুত বাড়ছে, বিশ্বের প্রচেষ্টা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশের পদক্ষেপ দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে, কারণ অনেক মানুষকে প্রচণ্ড গরমেও বাইরে কাজ করতে হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে শতাব্দীর শেষে গড় তাপমাত্রা ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, বিশেষ করে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি এবং মশাবাহিত ও অন্যান্য বাহকবাহিত রোগের ক্ষেত্রে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিসিএইচপিইউর সমন্বয়ক ইকবাল কবির।

