পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, উৎপাদন খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা ও কারখানার আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দুই পক্ষের এই অবস্থানের মধ্যে নতুন করে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে এই বোর্ড বসেই মজুরির অঙ্ক চূড়ান্ত করে দেবে না। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের সক্ষমতা যাচাই করে বোর্ড সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। শেষ পর্যন্ত নতুন মজুরি কত হবে, তা ঘোষণা করবে সরকার।
বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, মজুরি বোর্ড আসলে কীভাবে কাজ করে? শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা কি নিজেদের দাবি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? আর বোর্ডের সুপারিশের বাইরে গিয়ে সরকার কি মজুরির অঙ্ক পরিবর্তন করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বাংলাদেশ শ্রম আইনেই। মজুরি বোর্ডের গঠন ও কার্যপ্রণালি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের ফাহিমা কানিজ লাভার প্রকাশিত ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনেও বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সেই তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা ও সরকারি প্রজ্ঞাপন মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি বোঝা জরুরি।
বোর্ডে কারা থাকেন, দুই পক্ষের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হয়?
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠিত হয়। আইনে বোর্ডের মূল কাঠামোয় চারজন সদস্যের কথা বলা হয়েছে। তাঁরা হলেন একজন চেয়ারম্যান, একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং একজন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি। তবে নির্দিষ্ট কোনো শিল্পের মজুরি নির্ধারণের সময় সেই শিল্পের মালিক ও শ্রমিকপক্ষ থেকে আরও দুজন প্রতিনিধি যুক্ত হন। ফলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য বোর্ডের সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ছয়জন।
এবারের পোশাকশিল্পের মজুরি বোর্ডেও এই ছয়জন রয়েছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে। মূল বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। পোশাকশিল্পের পক্ষ থেকে মালিক প্রতিনিধি হিসেবে আছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন এবং শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ১ নভেম্বর পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব নিয়োগ দিয়েছে।
এখানে নিরপেক্ষ সদস্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মালিকপক্ষ চাইবে উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে। অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষ চাইবে তাঁদের জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর মতো বেতন নিশ্চিত করতে। দুই পক্ষের দাবির মধ্যে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সদস্যের মতামতও বিবেচনায় আসে। অর্থাৎ বোর্ডে শুধু মালিক বা শ্রমিকের বক্তব্য নয়, দুই পক্ষের বাইরে থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে।
শুধু দাবি শুনে মজুরি ঠিক হয় না
সরকার কোনো শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন মনে করলে বোর্ডকে তদন্ত ও সুপারিশের নির্দেশ দেয়। শ্রমিক বা মালিকপক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আবেদন আসতে পারে। এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যান সভা আহ্বান করেন। সেখানে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নতুন মজুরি কাঠামোর প্রস্তাব ও যুক্তি চাওয়া হয়। দুই পক্ষের প্রস্তাব পাওয়ার পর শুরু হয় আলোচনা।
প্রয়োজনে বোর্ডের সদস্যরা কারখানা বা শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করতে পারেন। শ্রমিকদের প্রকৃত আয়, কাজের পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কারণ কাগজে একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা আর একজন শ্রমিক সেই টাকা দিয়ে বাস্তবে কতটা চলতে পারবেন, বিষয় দুটি এক নয়।
বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৪১ ধারায় মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনমান, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত পণ্যের বাজারদর, কাজের ধরন, ঝুঁকি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের ব্যবসায়িক সক্ষমতা। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়।
সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। একজন পোশাকশ্রমিকের মাসিক আয় থেকে বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। এসব খরচ কতটা বেড়েছে, সেটি বোর্ডকে দেখতে হবে। একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন খরচ, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া দাম এবং শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। কারণ মজুরি খুব কম হলে শ্রমিকের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে, আবার শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত নিলেও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থান ও ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে। তাই এখানে কোনো একটি পক্ষের দাবি মেনে নেওয়ার বিষয় নয়, বরং বিভিন্ন বাস্তবতা মিলিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির চেষ্টা থাকে।
বোর্ডের হাতে কত দিন সময় থাকে?
আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, সরকার থেকে মজুরি নির্ধারণের নির্দেশ পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বোর্ডকে সুপারিশ জমা দিতে হয়। তবে বোর্ডের অনুরোধ থাকলে সরকার এই সময় বাড়াতে পারে। অর্থাৎ ছয় মাসের মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার বিধান থাকলেও প্রয়োজনে আলোচনা ও তদন্তের জন্য বাড়তি সময় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে বোর্ড মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মজুরি কাঠামোর সুপারিশ তৈরি করে। বিভিন্ন গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য আলাদা মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাবও থাকতে পারে। অর্থাৎ একজন নতুন কর্মী, একজন অভিজ্ঞ অপারেটর কিংবা দক্ষতাভিত্তিক দায়িত্বে থাকা শ্রমিকের মজুরি একই হবে, এমন নয়। আগের কাঠামোর মতো গ্রেডভিত্তিক মজুরি নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
বোর্ডের সুপারিশই কি শেষ কথা?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। অনেকের ধারণা, মজুরি বোর্ড যে অঙ্ক সুপারিশ করবে, সরকার সেটিই ঘোষণা করবে। বাস্তবে প্রক্রিয়াটি এত সরল নয়। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৪০ ধারা অনুযায়ী, বোর্ডের সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে। অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতেই থাকে।
তবে সরকার চাইলে বোর্ডের সুপারিশ সরাসরি গ্রহণ না করে সেটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারে। আইন অনুযায়ী, সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সরকার যদি মনে করে যে প্রস্তাবটি মালিক বা শ্রমিক কোনো পক্ষের জন্য ন্যায়সংগত হয়নি, তাহলে মন্তব্য ও প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বোর্ডের কাছে তা ফেরত দিতে পারে। এরপর বোর্ড আবার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে নতুন করে তদন্ত করবে এবং সংশোধিত সুপারিশ জমা দেবে। বোর্ড যদি মনে করে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, তাহলে তার কারণ জানিয়ে সরকারকে অবহিত করতে পারে।
সংশোধিত সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার গেজেট প্রকাশ করে চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণা করতে পারে। আইন অনুযায়ী, গেজেটে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক। কোনো মালিক এই নির্ধারিত হারের চেয়ে কম মজুরি দিতে পারবেন না। অর্থাৎ বোর্ড আলোচনা ও সুপারিশের জায়গা তৈরি করে, কিন্তু সেটিকে আইনগতভাবে কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের।
তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নিয়ে এত আলোচনা কেন এখন হচ্ছে, তার পেছনেও একটি আইনি বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের আগে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের ব্যবধান ছিল পাঁচ বছর। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে এই সময় কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। ফলে এখন সরকারের নির্দেশক্রমে প্রতি তিন বছর অন্তর শিল্পের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। তখন মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে মজুরি কাঠামোয় গ্রেডের সংখ্যা পাঁচটি থেকে কমিয়ে চারটি করা হয়েছিল। তিন বছরের হিসাব অনুযায়ী, এই কাঠামো পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরির ইতিহাস দেখলেও পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। প্রথম ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২৭ টাকা। এরপর ১৯৯৪ সালে তা বেড়ে ৯৩০ টাকা, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ টাকা এবং ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ কয়েক দশকে মজুরির অঙ্ক অনেক বেড়েছে। তবে একই সময়ে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য জীবনযাত্রার খরচও বেড়েছে। তাই শুধু আগের তুলনায় কত টাকা বেড়েছে, তা দিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত অবস্থার উন্নতি বোঝা যাবে না।
এবার বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
এবারের আন্দোলনে শ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান আয় দিয়ে বাড়িভাড়া, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং কারখানার আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাই নতুন বোর্ডের কাজ শুধু দুই পক্ষের দাবির মাঝামাঝি কোনো অঙ্ক বের করা নয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয় কত, বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে তাঁদের প্রয়োজন কতটা বেড়েছে এবং শিল্পের আয় ও উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু, সবকিছুর তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বোর্ডের আলোচনায় শ্রমিকদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা যেন গুরুত্ব পায়, সেটিও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত মজুরি কত হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ বোর্ডের আলোচনা, সুপারিশ এবং সরকারের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখনো বাকি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ শুধু একটি সংখ্যার সিদ্ধান্ত নয়। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের সংসার, পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জড়িত। তাই নতুন মজুরি কাঠামো কত টাকা হলো, তার পাশাপাশি কী বিবেচনায় সেই অঙ্ক নির্ধারণ করা হলো, সেটিও সাধারণ মানুষের জানার বিষয়।
সূত্রের স্বীকৃতি: মজুরি বোর্ডের গঠন, সদস্যদের ভূমিকা ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য নেওয়া হয়েছে দ্য ডেইলি স্টারের ফাহিমা কানিজ লাভার প্রকাশিত ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন থেকে।

