দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে গরমের সময় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর তৈরি হয় বাড়তি চাপ। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয় কমানোর দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ফ্যান ব্যবহার করা হলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বছরে বিদ্যুৎ খরচ বাবদ প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) সোমবার প্রকাশিত এক গবেষণায় এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত ফ্যানের পরিবর্তে ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট (বিএলডিসি) প্রযুক্তির ফ্যান ব্যবহার করা হলে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
সন্ধ্যায় ফ্যানের বিদ্যুৎ চাহিদা সবচেয়ে বেশি
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে গৃহস্থালি ফ্যানের অবদান প্রায় ৩ হাজার ৩৬২ থেকে ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট। বিশেষ করে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ফ্যানের বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এ সময়ে বাসাবাড়িতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ফ্যান চালু থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়।
গবেষকদের মতে, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবহার আরও দক্ষ করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ, বিদ্যুতের অপচয় কমাতে পারলে তুলনামূলক কম সময় ও ব্যয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
সাধারণ ফ্যানের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ খরচ
গবেষণায় প্রচলিত ফ্যান ও বিএলডিসি প্রযুক্তির ফ্যানের বিদ্যুৎ ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে।
বিএলডিসি প্রযুক্তির একটি ফ্যান সাধারণত প্রায় ৩৫ ওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বিপরীতে প্রচলিত সাধারণ ফ্যানে বিদ্যুৎ খরচ হয় ৭০ ওয়াট বা তারও বেশি। অর্থাৎ একই ধরনের ব্যবহার ধরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহার করলে বিদ্যুতের খরচ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।
তবে দেশে এখনো এই প্রযুক্তির ফ্যানের ব্যবহার খুবই সীমিত। গবেষণার আওতায় পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ব্যবহৃত ফ্যানের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। বিপরীতে ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ ফ্যানই ছিল তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী।
গবেষণাটি দেশের ২৬টি জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চলের বিভিন্ন আয়ের ৪৩৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
দাম বেশি হওয়ায় আগ্রহ কম
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ পণ্যটির তুলনামূলক বেশি দাম।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারে একটি বিএলডিসি ফ্যানের দাম প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। অন্যদিকে প্রচলিত সাধারণ ফ্যান কেনা যায় প্রায় ২ হাজার টাকায়।
অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হলেও প্রাথমিকভাবে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের অনেকেই এসব ফ্যান কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবও এর ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষণায় সরকারি উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ ফ্যান একসঙ্গে কেনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে দাম কমানো সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকি, আর্থিক সহায়তা এবং কিস্তিতে ফ্যান কেনার সুযোগ চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ কমানোর সুযোগ
গবেষণায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করে বিদ্যুতের চাহিদা কমানো গেলে ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
অর্থাৎ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই একমাত্র সমাধান নয়। বরং বিদ্যুতের ব্যবহার দক্ষ করা গেলে নতুন উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তাও কমতে পারে।
এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
২০ বছরে কমতে পারে ৮ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত সুবিধার কথাও উঠে এসেছে গবেষণায়।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহার করা গেলে আগামী ২০ বছরে ৮ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট থেকে প্রায় ২৫ কোটি ৯৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলার আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে অর্জিত আয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান কেনার খরচ কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে পুরোনো ও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ফ্যান পরিবর্তনের কর্মসূচি চালু, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মানদণ্ড ও জ্বালানি দক্ষতার লেবেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নতুন ভাবনা
বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের ব্যবহার কতটা দক্ষ হচ্ছে, সে বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে ব্যবহৃত একটি সাধারণ ফ্যানের প্রযুক্তি পরিবর্তন করেই জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলা সম্ভব। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যানের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে।
সরকারি প্রণোদনা, সহজ কিস্তি, মানসম্মত পণ্যের নিশ্চয়তা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অর্থাৎ বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে সব সময় নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন নেই; কখনো কখনো বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রযুক্তি বদলালেও বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব।

