গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এবার আগামী সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছরে আরও সমপরিমাণ বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচ্যাম)। তবে এই লক্ষ্য অর্জন শুধু মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানোর ওপর নির্ভর করছে না। বিনিয়োগকারীরা কতটা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন, ব্যবসা পরিচালনায় নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে কি না এবং বিনিয়োগের মুনাফা সহজে দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্ভাবনা সামনে রেখে আগামী ৫ থেকে ৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অ্যামচ্যামের ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬। আয়োজকদের আশা, প্রদর্শনীটি নতুন বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এ বিনিয়োগ লক্ষ্যের কথা জানান। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। আগামী সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার আনার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে পুরো অর্থের বিনিয়োগ নিশ্চিতভাবেই আসবে, এমন দাবি করছে না সংগঠনটি। বরং বিদ্যমান মার্কিন বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশে এখনো ব্যবসা শুরু করেনি এমন নতুন কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে লক্ষ্যটি অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর আগে ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও অ্যামচ্যাম এই পরিকল্পনা তুলে ধরেছিল।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে। কোনো দেশে বড় বাজার, সস্তা শ্রম বা উৎপাদনের সুযোগ থাকলেই বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থ বিনিয়োগ করেন না। তাঁরা দেখতে চান, কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পাওয়া যাবে কি না, ব্যবসার নিয়ম হঠাৎ বদলে যাবে কি না এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের মুনাফা ও মূলধন দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না। অর্থাৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল জ্বালানি নিরাপত্তাকে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই একটি জ্বালানি রোডম্যাপ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সংগঠনটি। এবারের ট্রেড শোতেও এ নিয়ে আলাদা সেমিনার রাখা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি উৎপাদন খাতের উদাহরণেই বোঝা যায়। একজন বিনিয়োগকারী কারখানা স্থাপনের জন্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কারখানার উৎপাদন নিয়মিত ব্যাহত হলে তাঁর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। সময়মতো ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হবে, কমে যাবে মুনাফাও। তাই শুধু জমি বা শ্রমিকের সুবিধা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ ধরে রাখা যায় না। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তাও দিতে হয়।
সব ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগ আনার চেষ্টা না করে যেসব খাতে মার্কিন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার বেশি এবং বাংলাদেশে মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চায় অ্যামচ্যাম। এর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং আর্থিক সেবা। এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এলে শুধু অর্থ আসবে না, নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এবারের ইউএস ট্রেড শোতে এসব সম্ভাবনাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনীতে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও সাতটি স্টার্টআপ অংশ নেবে। মোট বুথ থাকবে ৬৩টি। অংশগ্রহণকারী বা প্রতিনিধিত্বকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার, শেভরন, এক্সন মবিল, মেটলাইফ, সিটি গ্রুপ, মাস্টারকার্ড, ভিসা, কোলগেট-পামোলিভ, পেপসিকো, কস্টকো, পিপিজি, ইউপিএস ও কারগিল।
প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, ভোগ্যপণ্য, উৎপাদন ও লজিস্টিকস, শিক্ষা এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসার জন্য আলাদা জোন থাকবে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে স্টার্টআপ জোন। দর্শনার্থীরা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুযোগও পাবেন। পাশাপাশি ট্রেড শোর দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরতে থাকবে হেরিটেজ কর্নার।
এবারের ট্রেড শোতে ছয়টি বিষয়ভিত্তিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি, নারী নেতৃত্ব, সিলেক্ট ইউএসএ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক। এসব আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও দেশের আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিরাও এবার অংশ নেবেন। তাঁদের সঙ্গে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীরাও আসবেন, যাঁদের এখনো বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। অ্যামচ্যাম সভাপতি কামালের মতে, নতুন ১০ থেকে ১২টি কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে পারাই হবে এবারের আয়োজনের অন্যতম বড় সাফল্য। অর্থাৎ প্রদর্শনীর লক্ষ্য শুধু মার্কিন পণ্য ও প্রযুক্তি পরিচিত করা নয়, বরং নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করাও।
১৯৯২ সালে অ্যামচ্যামের উদ্যোগে বাংলাদেশে ইউএস ট্রেড শোর যাত্রা শুরু হয়। মাঝে কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর প্রায় আড়াই বছরের বিরতি শেষে এবার আবার আয়োজনটি ফিরছে। একই সঙ্গে অ্যামচ্যামের ৩০ বছর পূর্তিও উদযাপন করা হচ্ছে। আগামী ৫ থেকে ৭ নভেম্বর প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা হোটেলে প্রদর্শনী চলবে।
বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে কিছু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। অ্যামচ্যাম সরকারের সঙ্গে আলোচনায় নির্দিষ্ট সময়ে অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়া, একক জানালা বা সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগের মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্থিতিশীলতাও চেয়েছে সংগঠনটি। এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থ খাটানোর আগে তাঁরা ভবিষ্যতের নিয়মকানুন সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা চান।
অন্যদিকে, অ্যামচ্যামের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান দেশের জাতীয় রাজস্বের ২০ শতাংশেরও বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু পণ্য আমদানি বা রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের জ্বালানি, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই অঙ্ক এখনো বিনিয়োগের নিশ্চয়তা নয়, এটি অ্যামচ্যামের একটি মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য। ইউএস ট্রেড শো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কতটি নতুন কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আসছে, কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে কত কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি হচ্ছে, তার ওপরই উদ্যোগটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে আগ্রহ দেখানো জরুরি, কিন্তু সেই বিনিয়োগ ধরে রাখার মতো ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করাই হবে সবচেয়ে বড় কাজ।

