দেশে তৈরি সুতার দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। মূলত কয়েক ধরনের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের পর বাজারে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রথমবারের মতো দেশীয় সুতার দামের নির্দিষ্ট সীমা ঘোষণা করেছে বিটিএমএ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩০ কাউন্টের একক কার্ডেড তুলার সুতার দাম প্রতি কেজি ৩ দশমিক ২৫ থেকে ৩ দশমিক ৪৫ মার্কিন ডলারের মধ্যে রাখতে হবে। তবে ঋণপত্রের ধরন অনুযায়ী দামে কিছুটা পার্থক্য থাকবে।
ঋণপত্রের ধরন অনুযায়ী সুতার দাম
বিটিএমএর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণপত্রের ক্ষেত্রে ৩০ কাউন্টের সুতার প্রতি কেজির দাম হবে ৩ দশমিক ২৫ থেকে ৩ দশমিক ৪০ মার্কিন ডলার।
অন্যদিকে, ৯০ দিন মেয়াদি বিলম্বিত পরিশোধের ঋণপত্রে একই সুতার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৩ দশমিক ৩০ থেকে ৩ দশমিক ৪৫ মার্কিন ডলার।
অর্থাৎ, অর্থ পরিশোধের সময়সীমার ওপর ভিত্তি করে সুতার সর্বোচ্চ দামে কিছুটা পার্থক্য রাখা হয়েছে।
কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত?
সম্প্রতি কয়েক শ্রেণির সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা তুলে নেওয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। তাঁদের আশঙ্কা, আমদানির সুবিধা সীমিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্থানীয় বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বিটিএমএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, রপ্তানিকারকদের উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনা করেই সুতার দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দামের বেশি অর্থ দাবি করলে সংশ্লিষ্ট পোশাক রপ্তানিকারক অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সব ধরনের সুতার দাম কি একই থাকবে?
নতুন নির্দেশনায় সরাসরি ৩০ কাউন্টের সুতার মূল্যসীমা নির্ধারণ করা হলেও অন্য কাউন্টের সুতার দাম হিসাবের ক্ষেত্রেও একটি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।
বিটিএমএ জানিয়েছে, ৩০ কাউন্টের সুতার নির্ধারিত দামকে মানদণ্ড ধরে অন্যান্য কাউন্টের মূল্য সমন্বয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের ব্যবহার, সুতার মান এবং প্রচলিত বাণিজ্যিক পদ্ধতি বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও সনদপ্রাপ্ত সুতার ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হবে। জৈব তুলা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপদ্ধতি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানসনদসম্পন্ন সুতার দাম পৃথকভাবে নির্ধারণ করা যাবে।
এসব ক্ষেত্রে সনদ অর্জনের শর্ত, বাড়তি কাঁচামাল খরচ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
নির্দেশনা কার্যকর, চলবে পরবর্তী ঘোষণা পর্যন্ত
বিটিএমএর পরিচালনা পর্ষদের অক্টোবর মাসের সভায় সুতার মূল্যসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরে রোববার সংগঠনটির মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্যসীমা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই মূল্যসীমা বহাল থাকবে।
সুতা আমদানির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করা হলেও বিদেশ থেকে সুতা আমদানির সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি।
বিটিএমএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে এখনো শুল্কমুক্তভাবে সুতা আমদানি করা সম্ভব।
ফলে দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীদের পাশাপাশি আমদানির বিকল্প সুযোগও থাকছে। তবে নতুন ব্যবস্থায় বাজারে সুতার দাম কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সময়মতো সুতা না পেলে বাড়বে সংকট
সুতার সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণের উদ্যোগকে ঘিরে তৈরি পোশাক খাতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, শুধু দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই পোশাক রপ্তানিকারকদের সব সমস্যার সমাধান হবে না।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীরা নির্ধারিত সময়ে সুতা সরবরাহ করতে না পারলে এই মূল্যসীমা রপ্তানিকারকদের কোনো কাজে আসবে না।
তৈরি পোশাকশিল্পে নির্ধারিত সময়ে কাঁচামাল পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতা সরবরাহে দেরি হলে কাপড় উৎপাদন থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি ও রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত কতটা সুফল মিলবে?
বিটিএমএর নতুন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য সুতার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে স্থানীয় মিলগুলোর নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ, পর্যাপ্ত সুতা উৎপাদন এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য সুতার দাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।
এখন দেখার বিষয়, বিটিএমএর নির্ধারিত মূল্যসীমা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ কতটা কমে।

